ছবি : সংগৃহীতসংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়াতে সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করার বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। জুলাই জাতীয় সনদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থবিল, আস্থা-অনাস্থা প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা— এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে যাতে মতপ্রকাশ ও ভোট দিতে পারেন সেই প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতি, সংসদের উচ্চকক্ষের কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক প্রস্তাব এসেছে। শনিবার সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এসব মতামত দিলেও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদসহ প্রায় ৪০ জন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাদের মতামত ও প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করবে কমিটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন আগামী ৯ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে উঠছে না সংবিধান সংশোধনী বিল।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানান, এ পর্যন্ত যতগুলো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে আজকের (শনিবার) আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল রিভিউ, প্রশাসনিক আদেশের ওপর বিচারিক এখতিয়ার এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর বিশ্লেষণধর্মী মতামত দিয়েছেন। সভায় মূলত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাঠামো, প্রধান নির্বাচন এবং উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সংসদের একই মেয়াদে উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত না হলে, সেই উচ্চকক্ষের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
এ জন্য উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে। একজন প্রস্তাব করেছেন, ভাইস প্রেসিডেন্টকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। সেই স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কি না, তা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্পিকার ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্য থেকে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রাখা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোনো পদ্ধতিই এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনায় এর সুনির্দিষ্ট কাঠামো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সম্ভাব্য ভূমিকা গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চকক্ষের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নেতৃত্ব নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়েও মতামত এসেছে। বিশেষজ্ঞদের লিখিত মতামত পাওয়ার পর কমিটি এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্গঠন, উচ্চকক্ষের কাঠামো এবং নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। এই বিধান সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করে বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে প্রস্তাবিত পরিবর্তনে অর্থবিল, আস্থা বা অনাস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো চারটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান শনিবারের বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ প্রস্তাবের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা যায়নি। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে সংসদে বিতর্ক, জবাবদিহি ও সদস্যদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের পরিসর বাড়তে পারে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থার চেয়ে আরও উন্নত সংবিধান পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা যেন সংস্কারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পায়, সে বিষয়ে কমিটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আসিফ নজরুল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন প্রণয়নের বিষয় বাদ পড়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে বৈঠকে আইনমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, বিষয়গুলো পরে আইন করে বাস্তবায়ন করা হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইনমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন কাঠামোয় গঠিত হবে, নির্বাচনব্যবস্থা এবং ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও কথা হয়েছে। তার প্রত্যাশা, এবার সংবিধানে ইতিবাচক ও কার্যকর পরিবর্তন আসবে এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে।
সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর কয়েকটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
আসিফ নজরুলও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর পাননি বলে সাংবাদিকদের জানান। তবে স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন করার কথা জানিয়েছেন বলে জানান সাবেক এই আইন উপদেষ্টা। এ ছাড়া সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিধান অথবা শক্তিশালী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও এসেছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কাজ করছে। গণভোট বা অন্যান্য রাজনৈতিক দাবির বিষয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে আসিফ নজরুল সংবিধান সংশোধন কমিটি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধে যেতে চাননি। তিনি বলেন, কোন প্রক্রিয়ায় কাজ হচ্ছে, তার চেয়ে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সংস্কার অর্জন করা যাচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা অংশ নেন। এ ছাড়া বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকরা অংশ নেন। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে তাদের লিখিত ও মৌখিক মতামত এবং প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
আগামী অধিবেশনে উঠছে না সংশোধনী প্রস্তাব : সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনা চললেও আগামী ৯ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে সংশোধনী প্রস্তাব উঠছে না। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, অধিবেশনটি মূলত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আহ্বান করা হয়েছে। এতে কয়েকটি বিল পাস এবং আরও কিছু বিল উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রস্তাব এ অধিবেশনে আসছে না।
গত ১৪ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধান অনুযায়ী, একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে