সাংগঠনিক শক্তিতে ক্ষয় মহানগর বিএনপির

রফিক রাফি

রাজনীতি

ঢাকা মহানগর বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। হামলা-মামলাসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেল

2026-10-26T00:36:11+00:00
2026-10-26T00:36:27+00:00
 
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
রাজনীতি
সাংগঠনিক শক্তিতে ক্ষয় মহানগর বিএনপির
রফিক রাফি
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৬ এএম  আপডেট: ২৬.১০.২০২৬ ১২:৩৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা মহানগর বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। হামলা-মামলাসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। 

অন্যদিকে দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় না থাকা কিছু নেতা ও সুবিধাভোগী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন বলে দাবি করছেন নেতাকর্মীদের একটি অংশ। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে বলে মনে করছেন মাঠকর্মীরা। এতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা, অভিজ্ঞ নেতাদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেতৃত্বের সংকটের কথা। 

নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেতাদের পাশে না রাখলে রাজধানীতে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হবে। ভবিষ্যতে নেতৃত্ব সংকটের পাশাপাশি  আন্দোলন সফলে বেগ পেতে হবে দলকে। বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে যারা আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন উপেক্ষিত। বিপরীতে দুঃসময়ে সক্রিয় না থাকা কিছু ব্যক্তি সরকার ও দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে জায়গা করে নিচ্ছেন। 

এতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সময়ের আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের পরও তাদের জন্য প্রত্যাশিত কিছু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী দলে ঢুকে পড়েছে। এতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে এবং কেউ কেউ দল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ঢাকার প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ে আলোচনা : ঢাকা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মির্জা আব্বাস, প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা, সালাহউদ্দিন আহমেদ, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আমিনুল হক এবং এম এ কাইয়ুমের মতো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে এসব নেতার অবস্থান, সক্রিয়তা ও মূল্যায়ন নিয়ে দলের ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে।

বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, মরহুম ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত, মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজ, মরহুম লেফটেন্যান্ট জেনারেল অব. মীর শওকত হোসেন ঢাকায় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

পরবর্তী সময়ে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির প্রধান দুই সংগঠক। তাদের নিজস্ব বলয় ছিল। তাদের আলাদা বলয় থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে দুজনেরই শক্ত অবস্থান ছিল। খোকার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে দলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

মির্জা আব্বাস বর্তমানে অসুস্থ। 
তার অনুসারীদের দাবি, অসুস্থ হওয়ার আগেও তিনি দলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সম্মান পাননি। অন্যদিকে অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুর পর তার পরিবারও যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক নেতার ভাষ্য, দলের দুঃসময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতাদেরই যদি যথাযথ মূল্যায়ন না করা হয়, তা হলে অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তি : গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আমিনুল হক এবং সদস্যসচিব ছিলেন মোস্তফা জামান। মিরপুরে রাড্ডা মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

দলের নেতারা বলছেন, ঢাকা মহানগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটে কমিটি শুধু পদধারীদের তালিকা নয়। এর সঙ্গে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের কর্মীদের সমন্বয়, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বজায় রাখার বিষয় জড়িত। তাই কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও মাঠ পর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণে রফিকুল আলম এবং তানভীর আহমেদ রবীনসহ দায়িত্বশীল নেতাদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। তানভীর আহমেদ রবীন বর্তমানে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


অন্যদিকে মহানগর দক্ষিণের দায়িত্ব পালনকারী বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বর্তমান রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় উত্তরের নেতা সাইফুল ইসলাম নীরব ও সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

ইশরাকের পদত্যাগে নতুন আলোচনা : ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ। পুরান ঢাকার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ইশরাক গত আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এরপর তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়। এ ঘটনায় তার সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, মাদকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন এক বক্তব্যে বলেন, ইশরাকের সাম্প্রতিক কাজের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে তার রাজনৈতিক পরিচয়, দীর্ঘদিনের আন্দোলনে ভূমিকা ও আত্মত্যাগকে শুধু পদত্যাগের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায় না। দল ও দেশের জন্য তার অবদানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

রাজনৈতিক ফ্রেমিংয়ের অভিযোগ : বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঢাকার কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে নেতাদের বিতর্কিত করা হলে দল সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এক নয়। নেতাকর্মীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ যাচাই না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ত্যাগী নেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আবার অন্যদিকে দলের কেউ অনিয়মে জড়ালে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। তাই অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সবার জন্য একই নীতি অনুসরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার কাজ শুরু করার পর থেকেই একটি শ্রেণি নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকার— উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চান বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় ঢাকা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নেতাকর্মীদের মতে, রাজধানীতে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হলে অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সময়ের আলোকে বলেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনশীল। আজকের কর্মীরাই আগামী দিনে দলের নেতৃত্ব দেবেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন। তবে অভিজ্ঞতার আলাদা মূল্য রয়েছে। বিএনপি নতুন নেতৃত্ব তৈরির পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও সামনে রাখছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   সাংগঠনিক শক্তি  মহানগর  বিএনপি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: