সংগৃহীত ছবিপোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা বা ৩০০ ডলার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে চারটি জোটের ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন। একই সঙ্গে ২০২৬-২০২৯ মেয়াদে তিন বছরের জন্য নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং সেখানে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধিকে সদস্য করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জোট ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) শীর্ষ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মো. আবু জাফর। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জোটের নেতা খালেকুজ্জামান লিপন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন নাহিদুল ইসলাম নয়ন। সূচনা বক্তব্য দেন আবুল হোসেন।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে শ্রমিক নেতারা বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ১১টি বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন ও ঝুঁকি, কাজের মান, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়।
এসব মানদণ্ড বিশ্লেষণ করেই ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানানো হয়েছে বলে জানান নেতারা। তারা বলেন, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ।
শ্রমিক নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয় ছিল ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছিল ২৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। গত ১০ বছরে এ খাতের রফতানি আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। তাদের দাবি, এ সময়ে তৈরি পোশাক কারখানা ও শ্রমিকের সংখ্যা কমলেও রফতানি আয় বেড়েছে। ফলে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাতের উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত শ্রমিকদের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক নেতারা আরও বলেন, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার হিসাব, মাথাপিছু আয় এবং দারিদ্র্যসীমার ওপরে জীবনযাপনের ব্যয় বিবেচনায় নিলে একজন শ্রমিকের পরিবারের মাসিক ব্যয় অনেক বেশি দাঁড়ায়। বিভিন্ন হিসাবে এ ব্যয় ৫৭ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে।
নেতারা বলেন, একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি যদি পরিবারের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করেন, তা হলেও তার মাসিক আয় ৩৭ থেকে ৩৮ হাজার টাকা হওয়া প্রয়োজন। অথচ বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন, বিনোদন, আকস্মিক অসুস্থতা, ঈদ-পূজার খরচ এবং বাড়িতে যাতায়াতের ব্যয় এসব হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।
নেতারা আরও বলেন, অনেক অর্থনীতিবিদ পরিবারের খাদ্য ব্যয় ও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় সমান ধরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের হিসাব করেন।
চার সদস্যের একটি পরিবারের খাবারের খরচ ৩৫ হাজার ৮০ টাকা হলে মোট মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এ বাস্তবতায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক নেতারা সরকারি বেতনকাঠামো, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের বিশেষ জরিপ, বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয়, মাথাপিছু আয়, উৎপাদনশীলতা, মূল্য সংযোজন, প্রতিযোগী দেশগুলোর ন্যূনতম মজুরি এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
তারা বলেন, মালিকদের আর্থিক সক্ষমতা ও শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের সহকারী অপারেটর পদে বা চাকরির শুরুতে ন্যূনতম মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ জন্য দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন এবং সেখানে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধিকে মনোনয়ন দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে নঈমুল আহসান জুয়েল, লাভলী ইয়াসমীন, বাচ্চু মিয়া, রফিকুল ইসলাম সুজন, আসাদ চৌধুরী, সালেহা ইসলাম সান্ত্বনা, সুমাইয়া ইসলাম, শামীমা আক্তার ও বাপ্পী দেব বর্মণসহ চারটি জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/কেএইচও