মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে টেক্কা দিচ্ছে বাংলাদেশ!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। সংস্থাটির অক্টোবরের

2026-10-25T20:42:53+00:00
2026-10-25T20:42:53+00:00
 
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
অর্থনীতি
আল-জাজিরার প্রতিবেদন
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে টেক্কা দিচ্ছে বাংলাদেশ!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪২ পিএম 
ঢাকার কাছে ধামরাইয়ে স্নোটেক্স পোশাক কারখানায় কাজ করছেন বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। ছবি : আলজাজিরা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। সংস্থাটির অক্টোবরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।

তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেই যে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি অন্য দেশের তুলনায় শক্তিশালী, এমন নয়। কারণ, মোট অর্থনীতির আকার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং আয়ের বৈষম্যও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির উদাহরণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় বাংলাদেশের অর্জন এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার অর্থ কী?

একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বলা হয়। মোট জিডিপিকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে, ভারতের অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় আট গুণ।

অর্থাৎ, মোট অর্থনীতির আকারে ভারত অনেক এগিয়ে থাকলেও জনসংখ্যার অনুপাতে উৎপাদনের হিসাব করলে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকতে পারে।

তবে মাথাপিছু জিডিপি কোনো দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রকৃত আয় নির্দেশ করে না। এটি একটি গড় হিসাব, যা দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পূর্ণ চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।

ক্রয়ক্ষমতায় এগিয়ে ভারত

মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বিবেচনায় ভারত এগিয়ে রয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপি অনুযায়ী ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা দাঁড়াতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলারে।

পিপিপি হিসাব করার সময় দুই দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যের দামের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে এই হিসাব দিয়ে বোঝা যায়, স্থানীয় বাজারে অর্থ দিয়ে কতটা পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব।

এ ছাড়া চলতি বছর ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশে এই হার হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবৃদ্ধিতে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

মাথাপিছু জিডিপির পূর্বাভাসে এগিয়ে থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিতে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

তুলনামূলকভাবে ভারতের অর্থনীতি প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজার ও শক্তিশালী শিল্পভিত্তিও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় চালিকাশক্তি রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ভবিষ্যতে কী হতে পারে?

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার। ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

তবে বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সে সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার। অর্থাৎ, ওই বছর ভারত আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির নিকট ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া মাথাপিছু জিডিপির হিসাব বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেও ওঠানামা করতে পারে। ফলে উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলেও মুদ্রার মান পরিবর্তিত হলে ডলারে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপি বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের অগ্রগতিতে পোশাকশিল্পের ভূমিকা

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বছরে প্রায় ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও দীর্ঘমেয়াদে কমেছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের মূল্য সংযোজনের অংশ ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

মেহরোত্রার মতে, রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্পের বিকাশে বাংলাদেশ ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে।

দেশটির প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস। এ ছাড়া বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এর বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পণ্য পরিবহনের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এ শিল্পও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কি সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে?

মাথাপিছু জিডিপি বাড়লেও আয় ও সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল সমানভাবে পৌঁছায় না। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেই গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে ধনী পরিবারের মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

এ কারণে শুধু মাথাপিছু জিডিপির পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রকৃত আয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ, পণ্যের দাম, ক্রয়ক্ষমতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনও বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো, রপ্তানি খাতের সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র : আল-জাজিরা
  বিষয়:   ভারত  বাংলাদেশ  মাথাপিছু  জিডিপি 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: