গ্রাফিক : সময়ের আলোজাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী সভায় মোট ১৫টি প্রকল্প উঠবে। এরমধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকার বড় দুটি প্রকল্প রয়েছে। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন ক্রয় প্রকল্প। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
আরেকটি হচ্ছে তিতাসে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খনন প্রকল্প। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা।
এছাড়া ধানমন্ডি, শাহবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক মেরামতে ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্পও উঠছে একনেকে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশের জন্য ৫ হাজার ৮৩০ যানবাহন ক্রয় প্রকল্প : পুলিশের জন্য ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন ক্রয়ে যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তাতে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগের মধ্যে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়ে এবং ২২৮০.১৪ কোটি টাকা খরচ হবে ১০০১টি বিশেষায়িত যানবাহনের জন্য।
পুলিশের দীর্ঘদিনের যানবাহন সংকট, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং দেশব্যাপী আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার জন্য ৬৬০৮.১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্প অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত হয়েছে এবং এর সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান যানবাহন এবং তাদের কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবিত ক্রয় প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক পুলিশ স্টেশনে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পরিষেবা দেওয়ার জন্য ১২৩৭টি যানবাহন রয়েছে।
প্রতিটি স্টেশনে গড়ে দুটিরও কম যানবাহন এবং বিদ্যমান বহরের প্রায় ৬৪ শতাংশ এক দশকেরও বেশি পুরোনো হওয়ায় পুলিশকে নিয়মিত টহল বজায় রাখা, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় স্থানে কর্মী মোতায়েন করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের ফলে পুলিশের চলাচল সক্ষমতা ও কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে অপরাধ, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশ আরও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারবে।
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নির্দিষ্ট প্রয়োজন মেটাতে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানবাহন, দুর্গম এলাকায় চলাচল উপযোগী যানবাহন, ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টার ও অপরাধস্থল পরিদর্শনের জন্য বিশেষায়িত ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব যানবাহন জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এবং ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে আলামত সংগ্রহে সহায়তা করবে। আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় দেশের বিস্তৃত নদীপথে পুলিশি কার্যক্রম জোরদারে স্পিডবোট ও দেশীয় নৌকা কেনার প্রয়োজনীয়তাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জলযানগুলো নৌপথে টহল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং জরুরি উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করবে।
যানবাহন কেনার পাশাপাশি প্রকল্প দুটিতে সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের অধীনে ৬৫০ জনকে হালকা যানবাহন চালনা ও মেকানিক্স প্রশিক্ষণ, ৩০০ জনকে ভারী যানবাহন চালনা ও মেকানিক্স প্রশিক্ষণ এবং আরও ৫০ জনকে যানবাহন মেরামত বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
৫৯২ কোটি টাকায় খনন হবে দুটি নতুন কূপ : এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বৃহত্তম গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র তিতাসে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে।
‘তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ (তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩) খনন’ শীর্ষক প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়ক মেরামতে ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাথ ও নর্দমা সংস্কারে ৭১৪ কোটি টাকা খরচ করবে সরকার। এ জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উঠবে।
এ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, শাহবাগ, রমনা, পল্টন, শাহজাহানপুর, লালবাগ, বংশাল, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিলের সড়ক, ফুটপাথ ও নর্দমা সংস্কার করা হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
কী আছে প্রকল্পে : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন প্রধান সড়কগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, নর্দমা ও ফুটপাথ সংস্কার এবং উন্নয়নে এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা একনেকে উঠবে। এ বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, শাহবাগ, রমনা, পল্টন, শাহজাহানপুর, লালবাগ, বংশাল, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিল এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নগরের বিভিন্ন সড়ক ও নর্দমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যানবাহন চলাচল ও পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া পথচারীদের চলাচলের উপযোগী ফুটপাথ তৈরি এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া প্রধান সড়কের বিভাজক সংস্কারও করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুসারে মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ২১৪ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারি অর্থের ৬০ শতাংশ ঋণ ও ৪০ শতাংশ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
তুরাগে বর্জ্য ফেলা ড্রোনে নজরদারি করা হবে : শিল্প-কারখানার বর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎসের দূষণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে তুরাগ নদ ঘিরে ১৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ‘মেট্রো ঢাকা পানি নিরাপত্তা ও সহনশীলতা কর্মসূচির’ আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ অধিদফতর।
এ বছরের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সাভার পৌরসভার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তুরাগ নদের দূষণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হবে। দূষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে হটস্পট মানচিত্র তৈরি করা হবে। পাশাপাশি নদে বর্জ্য ফেলছে, এমন অননুমোদিত ও অনিয়মিত শিল্প-কারখানার তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারকি জোরদার করা। আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। নদীর দূষণ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। নদীর তীরে অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কি না তা নজরদারিতে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানার পানির গুণগত মান তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে