প্রতীকী ছবিচলতি বছরের মার্চে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় জ্বালানি সংকট দেখা দেয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে। এর প্রভাবে দেশে দেশে দেখা দেয় চরম মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি, যার ধাক্কা লাগে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও। কলকারখানার চাকা শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারেও এখন এর প্রভাব দারুণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে নতুন করে পুঁজিবাজারে আসছে না বিনিয়োগ। কলকারখানার চাকা শ্লথ হওয়ায় ব্যাংকিং কার্যক্রমেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কোনো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সহসাই দেশের পুঁজিবাজারে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না বাজার-সংশ্লিষ্টরা। বিগত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহের বাজার বিশ্লেষণেও এমনটাই দেখা গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে গত ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিন কার্যদিবসে বাজারে মিশ্র প্রবণতা ছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে প্রধান সূচক সামান্য কমলেও নির্বাচিত বড় কোম্পানির সূচকে উত্থান হয়েছে। তবে দৈনিক গড় লেনদেন কমেছে ১৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ২১৩টি কোম্পানির শেয়ারদর কমার বিপরীতে বেড়েছে ১২৬টির। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকগুলোতে সামান্য উত্থান দেখা গেলেও লেনদেনের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক সীমিত।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ১৯ অক্টোবরের বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, তিন কার্যদিবস শেষে প্রধান সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে। আগের সপ্তাহের তুলনায় সূচকটি কমেছে শূন্য দশমিক ০৩ শতাংশ। তবে নির্বাচিত ৩০টি কোম্পানির সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিপরীতে শরিয়াহ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাজারের সব অংশে একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা ছিল না।
আলোচ্য সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৫ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় কম। লেনদেনের এই সংকোচন বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সময়ে ৪২টি কোম্পানির শেয়ারদর অপরিবর্তিত ছিল এবং ৩০টি কোম্পানির শেয়ারে কোনো লেনদেন হয়নি।
দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল আরএসআরএম স্টিল। কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ফিনিক্স ফাইন্যান্সের দর বেড়েছে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ও প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদরও বেড়েছে। বিপরীতে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের দর কমেছে ১৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। এপেক্স ফুটওয়্যার, এমএল ডাইং, ডিএসএইচ গার্মেন্টস ও বাংলাদেশ ল্যাম্পসও দরপতনের তালিকায় ছিল।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে আলোচ্য তিন কার্যদিবসে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ সময়ে ২২৮টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। প্রধান সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ১৮৭৪ শতাংশ, নির্বাচিত কোম্পানির সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৪৭১ শতাংশ এবং সার্বিক সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩০০৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেনের ৮১ দশমিক ২৮ শতাংশ ছিল ‘এ’ শ্রেণির শেয়ারের দখলে। ‘বি’ শ্রেণির শেয়ারে লেনদেন হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ‘জেড’ শ্রেণিতে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এ বাজারে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি হয়েছে এবি ব্যাংক প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের, ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে অ্যাডভেন্ট ফার্মার শেয়ারদর কমেছে ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের কমেছে ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে এমন পরিস্থিতির পেছনে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান, নতুন বিনিয়োগে অনীহা এবং শেয়ার কেনাবেচায় বাছাইপ্রবণতা ভূমিকা রাখতে পারে। সপ্তাহের তিন কার্যদিবসে প্রধান সূচক প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও দরপতন হয়েছে ২১৩টি কোম্পানির, বিপরীতে দর বেড়েছে ১২৬টির। এতে বোঝা যায়, প্রধান সূচকের সামান্য পরিবর্তনের আড়ালে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল।
লেনদেন কমে যাওয়াও বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত। তাদের মতে, আগের সময়ের তুলনায় লেনদেন কমে গেলে তার পেছনে নতুন অর্থ বিনিয়োগে অনীহা, মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা কিংবা শেয়ারের ভবিষ্যৎ দর নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করতে পারে।
কিছু কোম্পানির শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দর বৃদ্ধির বিপরীতে অন্য কয়েকটি কোম্পানিতে বড় দরপতনও বাজারে অসম প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা পুরো বাজারে সমানভাবে বিনিয়োগ না করে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে আগ্রহ দেখাতে পারেন। আবার কোনো কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, লভ্যাংশ ঘোষণা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কিংবা সংশ্লিষ্ট সংবাদও তার শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোম্পানির দর পরিবর্তনের পেছনে এসব কারণ কাজ করেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে সূচকের সীমিত পরিবর্তনের পাশাপাশি লেনদেন হ্রাস এবং দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা বেশি থাকার বিষয়টি বাজারের দুর্বলতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দেয়। বাজারের এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার তথ্য, নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে