গ্রাফিক : সময়ের আলোদেশে ধান-চালের সংকট নেই। পরপর দুই মৌসুমে বোরোতে বাম্পার ফলন হয়েছে, সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদও সন্তোষজনক। বড় চালকল মালিকদের হাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ ধান-চাল। এরই মধ্যে নতুন আমন ধানও উঠতে শুরু করেছে মাঠ থেকে। তারপরও স্বস্তি নেই চালের বাজারে। উল্টো এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দাম। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও চালের দাম কেন বাড়ছে— এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ক্রেতারা। বাজার-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মিল মালিক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কারসাজিও দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। ফলে উৎপাদন ও মজুদের স্বস্তি থাকলেও চাল কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে।
গত বোরো মৌসুমে দেশে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। রেকর্ড ২ কোটি ১৮ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। আগের বছর বোরোতে চালের উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ১৩ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ পরপর দুই মৌসুম দেশে বোরোতে বাম্পার ফলন হয়েছে। এবারের আমন মৌসুমে চালের উৎপান লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। ইতিমধ্যেই আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং ফলনও ভালো হচ্ছে।
অপরদিকে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মজুদও পর্যাপ্ত রয়েছে। সরকারি খাদ্য গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে ২২ লাখ ৫২ হাজার ১৯০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু চালের মজুদই আছে ১৮ লাখ ৮০ হাজার ১৯৫ মেট্রিক টন।
আবার খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের যৌথ তদারকি রিপোর্টের তথ্য বলছে, দেশের ১৭ হাজার চালকলের মধ্যে বড় ৫০০ মিলারের হাতেই এখন ২০ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল মজুদ আছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দেশে ধান এবং চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, অথচ বাজারে দাম বাড়ছে চালের। গত এক মাসের ব্যবধানে পাইকারিতে বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা দাম বেড়েছে চালের।
প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের কষ্ট বেড়েছে। এমনিতেই বাজারে মাছ, মাংস, দুধ-ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে সব ধরনের সবজির দামও অনেক চড়া। আবার আরেক প্রধান খাদপণ্য আটা-ময়দার দামও বেড়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে আটা-ময়দার দাম বেড়েছে গড়ে ৬ থেকে ৮ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে গড়ে ১২ থেকে ২৫ শতাংশ। এভাবে প্রধান দুই খাদ্যপণ্য চাল ও আটা-ময়দার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে ধান-চালের কোনো সংকট নেই। তবু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছে চালের। এ ব্যাপারে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বাজারে এখন প্রতি সপ্তাহেই ১-২ টাকা করে দাম বাড়ে চালের। আবার কোনো সপ্তাহে ৫০ পয়সা কমে।
এভাবে কেজিতে ২ টাকা বাড়িয়ে ৫০ পয়সা কমায়। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা যে যার ইচ্ছামতো ব্যবসা করে চালের দাম বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া চালের বাজারে তো সরকারি কোনো সংস্থার লোকেরা তেমন একটা কেউ যায় না— এ জন্য ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বাজারে চালের সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। তবু দাম বাড়ছে। মিল পর্যায়ে মজুদ রেখে কম করে সরবরাহ করছে। তবে কারসাজির সঙ্গে মিল মালিক, পাইকারি ও খুচরা— সবাই যুক্ত। চালের দাম বাড়ানোর কোনো কারণে দরকার পড়ে না তাদের, ইচ্ছামতো তারা দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
এতে সাধারণ মানুষের কষ্টের মাত্রা বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি দরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, বাজার কারসাজি করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে; কিন্তু বাস্তাবে তো তেমন কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। চালের বাজারে সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা চালু রাখা দরকার।’
চালের বাজার পরিস্থিতি : রাজধানীর বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে চালের দাম। জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি চাল কিনতে এখন ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে চাপ আরও বাড়ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের মধ্যে চালের এই বাড়তি দাম তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি চালের বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে ব্যবসায়ীরা জানান, গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরির মতো মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দিন দশেক আগেও ছিল ৫০ থেকে ৫৪ টাকা।
মাঝারি মানের বিআর-২৮ চালের দাম ২ টাকা বেড়ে ৬৪ থেকে ৬৬ টাকা এবং পাইজাম চালের দাম ৬২ থেকে ৬৫ টাকা। সরু চালের মধ্যে মিনিকেট মান ও ব্র্যান্ডভেদে কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা এবং নাজিরশাইল মানভেদে ৮০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে একই জাতের চালের দাম সব দোকানে এক নয়। চালের মান, উৎপাদনকারী মিল, ব্র্যান্ড এবং কেনার সময়ের ওপর দাম নির্ভর করে। পুরোনো মজুদের চাল যেসব দোকানে রয়েছে, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে নতুন করে চাল কিনতে গেলে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
মোটা চালের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সীমিত আয়ের অনেক পরিবার এ ধরনের চালের দিকে ঝুঁকছে। তবে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট জাতের চাল খেতে অভ্যস্ত, তাদের পক্ষে সহজে চালের ধরন পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবহন খরচের প্রভাব দেখছেন ব্যবসায়ীরা : চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে পরিবহন ব্যয় ও পাইকারি বাজারের দামের পরিবর্তনের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে ঢাকায় চাল আনতে ট্রাকভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। তবে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকায় দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চালের সংকটকে দেখছেন না তারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের জননী রাইস এজেন্সির ম্যানেজার আবুল কালাম বলেন, আমাদের চাল কিনতে হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি দামে। পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে আগের দামে বিক্রি করলে লাভ থাকে না। তবে বাজারে চালের অভাব নেই। রাজধানীর বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ১ থেকে ৩ টাকা। বর্তমানে মোটা চাল ৫২-৫৬ টাকা, মাঝারি চাল ৫৮-৬৬ টাকা এবং সরু চাল ৭০-৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের ক্রেতারা।
আরেক ব্যবাসয়ী কবীর হোসেন বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়েও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু দাম বাড়লেই যে বাজারে চালের সংকট রয়েছে, তা নয়। নিয়মিত চাল আসছে। কেনার খরচ কমলে বিক্রির দামও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্যের সঙ্গে বাজারের দামের প্রকৃত পরিবর্তন মিলিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন ক্রেতারা। তারা জানান, পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব কতটা পড়ছে এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কত টাকা ব্যবধান থাকছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কেজিতে সামান্য বৃদ্ধি, মাস শেষে বড় অঙ্ক : চালের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিয়মিত চাল কিনতে হয় এমন পরিবারগুলোর ওপর। কারণ চালের ব্যবহার সহজে কমানো যায় না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল কিনতেই হয়। ফলে কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বৃদ্ধি পেলেও মাস শেষে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
কোনো পরিবার মাসে ৬০ কেজি চাল কেনে। কেজিতে ২ টাকা দাম বাড়লে ওই পরিবারকে মাসে অতিরিক্ত ১২০ টাকা ব্যয় করতে হবে। একইভাবে মাসে ৭০ কেজি চাল কিনলে বাড়তি খরচ দাঁড়াবে ১৪০ টাকা। চালের পাশাপাশি অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারওয়ান বাজারে শফিকুল আলম নামের এক ক্রেতা বলেন, চাল এমন একটি পণ্য, যেটা প্রতিদিন লাগে। অন্য কিছু কম কিনলেও চালের পরিমাণ খুব বেশি কমানো যায় না। দাম একটু একটু করে বাড়লে মাস শেষে তার প্রভাব বোঝা যায়। বাজার করতে এসে এখন সবকিছুর হিসাব মিলিয়ে চলতে হচ্ছে।
আরেক ক্রেতা বলেন, একই চাল কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। দোকানভেদেও দামের পার্থক্য আছে। তাই কেনার আগে কয়েকটি দোকানে দাম জেনে নিতে হয়। চালের বাজারে দাম যেন অকারণে না বাড়ে, সেটি দেখা দরকার।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও দাম বাড়লে তার যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু চালের বাজার নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার।
সুগন্ধি চালে বেশি দামের চাপ : সাধারণ চালের পাশাপাশি সুগন্ধি বা পোলাও চালের দামও ক্রেতাদের আলোচনায় রয়েছে। চিনিগুঁড়া ও কালিজিরাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চালের দাম ব্র্যান্ড ও মানভেদে অনেক বেশি। প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের কোনো কোনো ব্র্যান্ডের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। খোলা সুগন্ধি চালের দামও মানভেদে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। তবে সুগন্ধি চালের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হলে সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন ক্রেতারা।
চালের দাম সামান্য বাড়লেও মাস শেষে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে পরিবারগুলোর। কোনো পরিবার মাসে ৬০ কেজি চাল লাগলে কেজিতে ২ টাকা মূল্যবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ১২০ টাকা খরচ হবে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে এই ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমন ধান বাজারে এলে কি কমবে দাম : বাজার-সংশ্লিষ্টদের নজর এখন নতুন আমন ধানের দিকে। নতুন ধান ওঠা শুরু হলে চাল উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বাজারে দামের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে নতুন ধান উঠলেই খুচরা বাজারে চালের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ধান সংগ্রহের খরচ, চালকলের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন এবং বাজারের চাহিদার ওপরও দাম নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন আমনের সরবরাহ বাড়লে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তার আগে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষ করে মিলগেট, পাইকারি আড়ত ও খুচরা দোকানে চালের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোনো পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা গেলে বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পাওয়া যাবে।
চাল পাওয়া গেলেও আগের দামে কেনার স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। ব্যবসায়ীরা পরিবহন ও ক্রয়ব্যয়ের কথা বলছেন, আর ক্রেতারা চাইছেন দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই ও কার্যকর বাজার তদারকি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও