বদলি আতঙ্কে দেশের সাব-রেজিস্ট্রাররা

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত আছেন। শূন্য রয়েছে আরও ১৩৯টি পদ। ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে জনবল সংকটে ব্যাহত

2026-10-27T01:32:08+00:00
2026-10-27T01:39:06+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
বদলি আতঙ্কে দেশের সাব-রেজিস্ট্রাররা
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩২ এএম  আপডেট: ২৭.১০.২০২৬ ১:৩৯ এএম
ছবি : এআই জেনারেটেড
সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত আছেন। শূন্য রয়েছে আরও ১৩৯টি পদ। ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে নিবন্ধন কার্যক্রম। এতে জমি কেনাবেচা ও দলিল নিবন্ধনের মতো সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। এ পরিস্থিতিতে সোমবার একযোগে ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করেছে আইন ও বিচার বিভাগ। তাদের মধ্যে ঢাকার ১৮টি পদে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। বাকি ৬৭ জনকে বদলি করা হয়েছে লটারি ছাড়াই। লটারিতে নির্বাচিতদের পদায়ন হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ পর। এ ঘটনায় বদলি ও পদায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৬ অক্টোবর ঢাকার ১৮টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের পদায়নের জন্য লটারি অনুষ্ঠিত হয়। তখন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, ঢাকায় পদায়নে স্বচ্ছতা আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের দক্ষতা, কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতা ও কার্যালয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে তাদের পদায়ন করা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বা সুবিধাজনক কর্মস্থলেও পর্যায়ক্রমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে লটারি ছাড়াই ৬৭ জনকে বদলি করায় সেই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়ন পাওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তারা বহাল রয়েছেন। তাদের মতে, বদলির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনেক কর্মকর্তা ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ঘুরেফিরে গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ময়মনসিংহ সদরের সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসান দীর্ঘদিন একই জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সরকারিভাবে বিক্রি নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন এবং প্রতিটি দলিলের বিপরীতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সোমবার তাকে নেত্রকোনার বারহাট্টায় বদলি করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের ভালুকার সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমির দলিল নিবন্ধনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী তিনি অনেক জমিকে বনের জমি হিসেবে চিহ্নিত করলেও তার কর্মীদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হলে দলিল নিবন্ধন করেন। ত্রিশালের সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক প্রায় এক যুগ ধরে ঘুরেফিরে একই জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের আত্মীয় খন্দকার মেহবুবুল ইসলামও এক যুগের বেশি সময় ময়মনসিংহের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে শেরপুর সদরে কর্মরত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক এক উপদেষ্টার সুপারিশে চট্টগ্রাম সদরে সাব-রেজিস্ট্রার শহিদুর রহমান জনি, রাঙ্গুনিয়ায় এইচ এম মিরাজ সৌরভ এবং পটিয়ায় মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ পদায়ন পেয়েছিলেন। সৌরভের বিরুদ্ধে সরকারি বনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। মেসবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তাকে একই জেলার গুরুত্বপূর্ণ হাটহাজারী কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

নোয়াখালী সদরের সাব-রেজিস্ট্রার বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এরপরও তিনি জেলা রেজিস্ট্রারের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব অতিরিক্ত হিসেবে পালন করছেন ফরিদপুরের জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে দলিলপ্রতি ৩০০ টাকা, নকলপ্রতি ২৫০ টাকা এবং বিয়ের সনদ যাচাইয়ের জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী এ কাজে তার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী শিহাবের মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মন্ত্রণালয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। গণমাধ্যমের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান মন্ত্রী।

এদিকে সাব-রেজিস্ট্রারের ১৩৯টি পদ শূন্য থাকায় নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদফতরে নবম থেকে দ্বাদশ গ্রেডে ১৩৫ জন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেওয়া হবে ৮৪ জনকে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১ নভেম্বর থেকে অনলাইনে আবেদন শুরু হয়ে চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করে নতুন কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে যোগ দিতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।


সোমবার জারি করা বদলির আদেশে কর্মকর্তাদের ২৯ অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা আদেশে স্বাক্ষর করেছেন উপসচিব (রেজিস্ট্রেশন) মো. মাসুদ আলী। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।

ঢাকার ১৮টি কার্যালয়ে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদর থেকে অজয় কুমার সাহা (গুলশান), ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থেকে মণিষা রায় (তেজগাঁও), সাতকানিয়া থেকে টিনু চাকমা (ধানমন্ডি), নাগরপুর থেকে উম্মে সালমা (উত্তরা), সুজানগর থেকে আলী আজগর (বাড্ডা), শ্যামনগর থেকে নাজনীন জাহান (সূত্রাপুর), চিতলমারী থেকে ফরিদা আক্তার (ডেমরা) এবং ঘিওর থেকে শর্মিলা আহমেদ শম্পা (পল্লবী)। এ ছাড়া গোবিন্দ সাহাকে ঢাকা সদর, রাসেল মল্লিককে কেরানীগঞ্জ, এস এম আবু সূফীকে শ্যামপুর, মোহাম্মদ হানিফকে মোহাম্মদপুর, অমিত মোদক চাকমাকে নবাবগঞ্জ, জাহিদুর রহমানকে দোহার, রাজীব মজুমদারকে কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ এবং সিং মং থোয়াইকে আশুলিয়ায় পদায়ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় থেকে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। ঢাকা সদর থেকে মো. নোয়াজ মিয়াকে নরসিংদী সদর, সূত্রাপুর থেকে মো. আবরার ইবনে রহমানকে মাদারীপুরের শিবচর, মিরপুর থেকে মুহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন খানকে মানিকগঞ্জের ঘিওর, গুলশান থেকে আবদুল্লাহ আল মামুনকে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ, মোহাম্মদপুর থেকে আবদুল কাদিরকে সিলেট সদর এবং উত্তরা থেকে মোহাম্মদ মিরাজ উদ্দিনকে কক্সবাজারের উখিয়ায় বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ধানমন্ডি থেকে মো. আরিফুর রহমানকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, পল্লবী থেকে মো. জাহিদুল হককে মৌলভীবাজারের রাজনগর এবং আশুলিয়া থেকে মো. খায়রুল বাশারকে নরসিংদীর রায়পুরায় পাঠানো হয়েছে। ফতুল্লার সাব-রেজিস্ট্রার এস এম আদনান নোমানকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে গাজীপুরের টঙ্গীতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   বদলি আতঙ্ক  সাব-রেজিস্ট্রার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: