প্রায় ১৭০ বছর পর বিলুপ্ত ফুটি কার্পাস তুলা পুনরুদ্ধার ও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আবারও বাণিজ্যিকভাবে ফিরছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। সরকারি উদ্যোগে প্রাচীন সুতা তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার, নারী কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে এই ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের অর্ডারও সম্পন্ন হয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই বিশ্বের প্রথম সারির লাক্সারি ব্র্যান্ড হিসেবে রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্যে সমাদৃত ছিল বাংলাদেশের এই ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’। মুঘল আমলে এর আভিজাত্য এমন উচ্চতায় পৌঁছায় যে, মসলিনের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ শুধু সম্রাটদের পরিধানের জন্য সংরক্ষিত থাকত।
ঢাকাই মসলিন বুনন শুধু একটি সাধারণ কায়িক শ্রম ছিল না, এটি ছিল আবহাওয়ার সঙ্গে জড়িত এক জটিল লোকজ বিজ্ঞান। ফুটি কার্পাসের অতি-মিহি সুতা শুকনো বাতাসে ভেঙে যায়। তাই মসলিনের সুতা কাটার জন্য ভোরের সূর্য ওঠার আগের ও সন্ধ্যার পরের আর্দ্র আবহাওয়া বেছে নেওয়া হতো।
ফুটি কার্পাস। ছবি : সংগৃহীত
বিশেষ করে, শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা এই সুতা কাটার জন্য প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ ছিল। তুলা মাঠ থেকে সংগ্রহ করা, আঁশ ছাড়ানো, বিশেষ বোয়ালের চোয়ালের হাড় দিয়ে তুলা পরিষ্কার করা, অতি-সূক্ষ্ম তকলি ও চরকায় সুতা কাটা, সুতা ধোয়া ও বিশেষ নকশায় তাঁতে বুনন পর্যন্ত মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধাপ পার করে তবেই একটি প্রকৃত ঢাকাই মসলিন তৈরি হতো।
একটি আস্ত শাড়ি দিয়াশলাইয়ের বাক্সে এঁটে যাওয়া কিংবা একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে পার করে দেওয়ার গল্পগুলো মসলিনের অকল্পনীয় সূক্ষ্মতার ঐতিহাসিক প্রমাণ দেয়। নকশা ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে মসলিনের ছিল বিভিন্ন কাব্যিক নাম। যেমন : আবে-রওয়ান (প্রবাহিত পানি) ও শবনম (ভোরের শিশির)।
১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষবারের মতো আদি ঢাকাই মসলিন প্রদর্শিত হয়েছিল, এরপর এটি কেবলই ইতিহাস হয়ে যায়। প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যানচেস্টারের মিলের তৈরি সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, দেশীয় তাঁতিদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন ও শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ এই শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে। মসলিন তৈরির একমাত্র বিশেষ কাঁচামাল- মেঘনা নদীর অববাহিকায় জন্মানো ‘ফুটি কার্পাস’ তুলা গাছটি একপর্যায়ে প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, যা এই শিল্পের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।
ঢাকাই মসলিন। ছবি : সংগৃহীত
২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারে একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষক দল গঠন করে। ১৭৮৮ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের লেখা বইয়ের স্কেচ ও ঐতিহাসিক সূত্র ধরে গবেষকেরা কাপাসিয়া, গাজীপুর, বাঘাবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৩৯টি বন্য তুলার জাত সংগ্রহ করেন। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সঙ্গে সংগৃহীত তুলার ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ও জিনোম ম্যাচিং করে অবশেষে শতভাগ খাঁটি ‘ফুটি কার্পাস’ শনাক্ত ও চাষ করা হয়।
মসলিন বোনার জন্য আদি ৫০টিরও বেশি বিশেষ যন্ত্রপাতি আবার নতুন করে প্রস্তুত করতে হয়েছে। সাধারণ সুতি কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০ হয়, সেখানে পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিনের সুতা ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক কাউন্ট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে, যা কাপড়টিকে স্বচ্ছ করে।
প্রথম ধাপের সফলতার পর সরকার বর্তমানে ১৮ দশমিক ৫ কোটি টাকার (১৮৫ মিলিয়ন বিডিটি) দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সামাজিক দিক হলো, মসলিনের এই অতি-সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য ৩০০রও বেশি প্রান্তিক নারীকে সুনিপুণভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্পিনারে রূপান্তর করা হয়েছে, যারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো এই পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন কিনতে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি বড় অর্ডারও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি বিশ্ববাজারের উচ্চবিত্তদের জন্য একটি প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন হিসেবে স্থান করে নেবে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক লাক্সারি রফতানি খাতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’কে কেন্দ্র করে বর্তমানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক সেমিনারে ফুটি কার্পাসের জাত আরও উন্নত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কাঁচামালের ঘাটতি মেটাতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার গ্রামীণ চাষিদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
একটি সুনিপুণ মসলিন শাড়ি বুনতে ২ থেকে ৪ জন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে। প্রথম দিকে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ ৩ দশমিক ৬০ লাখ টাকা হলেও ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে তা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর এবং ব্যাপকভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হলে শাড়ির বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নামিয়ে আনারও পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে এর একক মালিকানা ও স্বত্ব নিশ্চিত করেছে।