ছবি : সংগৃহীতরাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ে ওএসডি হওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে কারা কী উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিলেন, সেই রহস্য কিছুতেই কাটছে না। গোপন বৈঠক, মাদক ও মদের ওই আড্ডায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। অভিযানের সময় তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৫ জন উচ্চপদস্থ ও পরিচিত মুখ স্থান ত্যাগ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন, যা নিয়ে বর্তমানে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিতর্কিত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মাইন্ডশেয়ার, এএমএল ও কমিউনিকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা এই রহস্যময় বৈঠকে অংশ নেন। প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ফিলিপ মরিস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং এসিআই মোটরসের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দাদের মতে, বিপুলসংখ্যক করপোরেট কর্মকর্তার এই জমায়েত কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর কোনো রহস্য বা ষড়যন্ত্র। রাতের এই অনুষ্ঠান থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কিছু তরুণ-তরুণীকেও আটক করা হয়েছে, যারা নিজেদের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। জানা গেছে, তারা এশিয়াটিক গ্রুপের হয়ে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাজ করতেন।
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল গত সোমবার রাতে ওই বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে। তবে অভিযান চলাকালে সরকারঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী কিছু মহল থেকে পুলিশের ওপর নানামুখী চাপ ও তদবির আসে। সমস্ত তদবির উপেক্ষা করে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কঠোর নির্দেশনায় ডিবি পুলিশ অভিযান অব্যাহত রাখে।
অভিযান শেষে সেখান থেকে মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ এবং ২৬ জন নারী। পরবর্তীতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আটক পুরুষদের ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরো ৩ দিনের কারাদণ্ড) এবং নারীদের ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ৩ দিনের কারাদণ্ড) দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২৬ জনকে কাশিমপুর কারাগারে ও বাকিদের কেরানীগঞ্জে পাঠানো হয়েছে।
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, আটক ব্যক্তিদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, আসামিদের থানায় হস্তান্তর না করে সরাসরি ডিবির তত্ত্বাবধানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা ও জরিমানা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে সাজাপ্রাপ্তদের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অনেকে ভুল ঠিকানা, পেশা বা ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের এসব সন্তানের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়ে, পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সন্তান এবং একটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার ট্রেইনি ক্যাপ্টেনও রয়েছেন।
গুলশান আরা ও দেবাশীষ-সংশ্লিষ্টতার নতুন মোড়
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই গোপন বৈঠকের সঙ্গে সম্প্রতি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরার সরাসরি যোগসাজশ থাকতে পারে। গত ১২ অক্টোবর পল্লবী ও বনানী থেকে গ্রেফতার হওয়া এই দুই কর্মকর্তার সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের তহবিলের তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবি উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িকে নিরাপদ ঘাঁটি বানিয়ে নিয়মিত ডিজে পার্টির নামে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের আসর বসানো হতো। সেখানে মদ, নারী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড অবাধে চলত। তল্লাশিতে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামসহ যৌন সামগ্রী জব্দ করা হয়। গোয়েন্দাদের ধারণা, এসব পার্টির মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা গং তাদের নির্দিষ্ট এজেন্ডার জন্য রিক্রুটমেন্ট পরিচালনা করতেন।
এশিয়াটিকের পুরোনো মাদককাণ্ডের ইতিহাস
এশিয়াটিক গ্রুপের বিরুদ্ধে করপোরেট কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে মাদক ও ইয়াবা পার্টি আয়োজনের অভিযোগ পুরোনো। পূর্বে একটি তামাক কোম্পানির জন্য নিয়মিত গোপন ইভেন্ট আয়োজন করত এশিয়াটিক, যা পরবর্তীতে মাদক কারবার উন্মোচনের পর বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে, ২০২১ সালে ঢাকার অদূরে ‘সারা রিসোর্টে’ এশিয়াটিকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ফরথোট পিআর (Forthought PR) ও ব্ল্যাকবোর্ড আয়োজিত একটি রাতের পার্টিতে বিষাক্ত মদ্যপানে ৪ জন মারা যান এবং বেশ কয়েকজন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে পুরোপুরি বা আংশিক অন্ধ হয়ে যান।
নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ফরথোট পিআরের মীর কায়সার ও শিহাব জহির এবং ব্ল্যাকবোর্ডের শরিফুজ্জামান ভূঁইয়া অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের হস্তক্ষেপে চার মৃত্যুর সেই ঘটনা পুলিশি তদন্তে ধামাচাপা পড়ে গেলেও অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে নতুন এই মাদককাণ্ডের পর ২০২১ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সময়ের আলো/কেআই