সংগৃহীত ছবিলেক, অতিথি পাখি, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর শিক্ষার্থীদের দেওয়া ব্যতিক্রমী নাম সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেন প্রকৃতি ও প্রাণচাঞ্চল্যের এক অনন্য মিলনস্থল। পরিচিত এই ক্যাম্পাসের বুকেই ছড়িয়ে আছে ‘সুইজারল্যান্ড’, ‘ময়না দ্বীপ’, ‘টারজান পয়েন্ট’ ও ‘রাঙ্গামাটি’র মতো বিচিত্র নামের কিছু জায়গা, যেগুলো ঘিরে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব গল্প।
রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সবুজের সমারোহ, জলাশয়, ঋতুবদলের রূপ আর অতিথি পাখির আনাগোনায় বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যই এর একমাত্র পরিচয় নয়; শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা।
ক্যাম্পাসের পরিচিত স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া কিছু ব্যতিক্রমী নাম। এসব নামের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেও স্থানগুলোর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নামের এক ধরনের মিল খুঁজে পান ক্যাম্পাসবাসীরা। ফলে পরিচিত ক্যাম্পাসের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ।
১৯৬৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৭৫০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। আশির দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) জন্য ৫০ একর জমি ছেড়ে দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৭০০ একরে। বর্তমানে এর আয়তন ৬৯৭ দশমিক ৫৬ একর।
ঢাকা শহরের মুঘল আমলের নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ থেকে ১৯৭০ সালে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’।
১৯৭১ সালের ৪ জানুয়ারি স্নাতক পর্যায়ে প্রথম ক্লাস শুরু হয়। একই বছরের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আহসান বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
মাত্র চারটি বিভাগ অর্থনীতি, ভূগোল ও পরিবেশ, গণিত এবং পরিসংখ্যানে ২১ জন শিক্ষক ও ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের ব্যবধানে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমদ। বিভিন্ন সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন কবি সৈয়দ আলী আহসান, লোকসাহিত্যবিদ মজহারুল ইসলাম, লেখক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক আ ফ ম কামালউদ্দিন, অর্থনীতিবিদ আব্দুল বায়েসসহ অনেকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দেশের বহু পরিচিত শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদ, সেলিম আল দীন, কবি মোহাম্মদ রফিক, হায়াৎ মামুদ, মুস্তফা নূরুল ইসলাম, দিলারা চৌধুরী, বজলুর রহমান খান ও তারেক শামসুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। রসায়নবিদ অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির এবং ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. দানিউল হকও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির উল্লেখযোগ্য অবদান। দেশের প্রথম প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিভাগের অধীনে নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে গবেষণা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের থিসিস করার সুযোগ রয়েছে। এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়েও গবেষণা করা যায়। বিজ্ঞান গবেষণার জন্য রয়েছে ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের আবাসন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এবং বিভিন্ন ভবনে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাও ক্যাম্পাস জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায়ই ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ বলা হয়। বছরজুড়েই এখানে নাটক, বিতর্ক, আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নামে নির্মিত মুক্তমঞ্চ ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। বিকেল গড়ালে মুক্তমঞ্চ, খেলার মাঠ, ক্যাফেটেরিয়া চত্বর, টারজান পয়েন্ট, শহিদ মিনার ও অমর একুশের পাদদেশে জমে ওঠে আড্ডা, গান ও নানা আয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নাট্যকার ও অভিনেতা সেলিম আল দীন, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি, শহীদুজ্জামান সেলিম, সুমাইয়া শিমু, জাকিয়া বারী মম, আফসানা আরা বিন্দু ও মিম মানতাশার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ক্রীড়াঙ্গনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও মাশরাফি বিন মুর্তজা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল রেফারি জয়া চাকমা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে স্থপতি হামিদুজ্জামান খানের নকশায় নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’ এবং প্রধান ফটকের কাছে ‘অমর একুশ’ ভাস্কর্য ক্যাম্পাসের উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে এর লেক, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য। শীতের মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ক্যাম্পাসকে নতুন রূপ দেয়। লেকের পানিতে শাপলা, গাছের সারি আর পাখির ওড়াউড়ি মুগ্ধ করে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রকৃতিও বদলে যায়। কোথাও সবুজ ঘাসে ঢাকা ঢালু ভূমি, কোথাও জলাশয়ের পাশে গাছের সারি, আবার কোথাও নির্জন দ্বীপের মতো পরিবেশ। প্রজাপতির সংরক্ষণ ও প্রজনন বৃদ্ধির উদ্যোগের অংশ হিসেবে রয়েছে প্রজাপতি পার্ক; আয়োজন করা হয় প্রজাপতি মেলারও।
প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই ক্যাম্পাসের কিছু জায়গাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী পরিচিতি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নামগুলো যেন পরিচিত ভূখণ্ডকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির প্রতিফলন।
ক্যাম্পাসের ‘সুইজারল্যান্ড’ নাম শুনে বিদেশের কোনো পর্যটনকেন্দ্র মনে হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই রয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত একটি জায়গা ‘সুইজারল্যান্ড’। এর অবস্থান মওলানা ভাসানী হলের দক্ষিণ পাশে। সড়ক ছেড়ে ভেতরের দিকে এগোলে চোখে পড়ে সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু-নিচু ভূমি। তিন দিকে লেক এবং জলাশয়ের পাশে গাছের সারি জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। সবুজ ঢালু ভূমির দৃশ্যের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশের মিল খুঁজে পেয়েই হয়তো শিক্ষার্থীরা এর এমন নাম দিয়েছেন।
তবে নামটি কে বা কারা, কখন রেখেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। আনুষ্ঠানিক নাম না হলেও ক্যাম্পাসবাসীর কাছে জায়গাটি ‘সুইজারল্যান্ড’ নামেই পরিচিত।
নির্জনতার ‘ময়না দ্বীপ’ বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের ময়না দ্বীপের কথা পরিচিত। উপন্যাসের হোসেন মিয়ার স্বপ্নের সেই দ্বীপের নাম থেকেই কি জাহাঙ্গীরনগরের ‘ময়না দ্বীপ’ নামটির অনুপ্রেরণা? নিশ্চিত করে বলা যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন-সংলগ্ন লেকের অন্য পাশে গাছপালায় ঘেরা দ্বীপের মতো একটি জায়গাকে শিক্ষার্থীরা ‘ময়না দ্বীপ’ বলে ডাকেন। চারপাশের নির্জনতা ও গাছপালার আবেষ্টন জায়গাটিকে অন্যরকম আবহ দিয়েছে। নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলেও স্থানটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ‘ময়না দ্বীপ’ নামটির একটি কল্পনাময় মিল রয়েছে। ব্যস্ত ক্যাম্পাসের ভেতরে এমন নিরিবিলি পরিবেশ জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পূর্ব পাশে ঘন গাছপালায় ঘেরা একটি জায়গার নাম ‘টারজান পয়েন্ট’। নামটি শুনলে মনে পড়তে পারে ‘টারজান অব দ্য এপস’ উপন্যাসের সেই কাল্পনিক চরিত্রের কথা, যাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গল্প ও চলচ্চিত্র। ক্যাম্পাসের এই জায়গাটির দুইপাশে ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। চারপাশের গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে জায়গাটির সঙ্গে টারজানের জঙ্গলের কল্পিত জগতের মিল খুঁজে পেতে পারেন অনেকেই। এখানে টারজানের আগমনের কোনো গল্প নেই; নামটির পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ইতিহাসও জানা যায় না। তবে শিক্ষার্থীদের দেওয়া নামটি জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। ক্যাম্পাসের কাঁচা আমের শরবতসহ স্থানীয় খাবার ও আড্ডার স্মৃতিও জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
‘ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে’ বহুল প্রচলিত এই ধাঁধার উত্তর আজও বিতর্কের বিষয়। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুরগি চত্বর’ নামটি শুনলে শিক্ষার্থীদের মনে অন্য রকম কৌতূহল জাগতে পারে। জহির রায়হান মিলনায়তনের পশ্চিম পাশের একটি জায়গাকে শিক্ষার্থীরা ‘মুরগি চত্বর’ নামে চেনেন। এখান থেকে ঢাকাগামী শিক্ষার্থীদের জন্য বাস ছেড়ে যায়। ফলে যাতায়াতের প্রয়োজনে জায়গাটিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। নামটি কেন এমন হয়েছে, তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই। তবে ক্যাম্পাসের প্রচলিত নামগুলোর মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক নামগুলোর একটি।
রাঙ্গামাটি নামটি শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়, সবুজ বন আর মেঘের দৃশ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রের মতো ভূপ্রকৃতি নেই। তবু ক্যাম্পাসের একটি জায়গা পরিচিত হয়েছে ‘রাঙ্গামাটি’ নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ পেরোলেই দেখা যায় কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত লাল মাটির একটি ভূখণ্ড। ক্যাম্পাসবাসীরা জায়গাটিকে ‘রাঙামাটি’ নামে ডাকেন। লাল মাটির উঁচু-নিচু ভূমি থেকেই হয়তো নামটির উৎপত্তি। নামকরণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা না গেলেও জায়গাটির স্বতন্ত্র ভূপ্রকৃতির পরিচিতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
‘সুইজারল্যান্ড’, ‘ময়না দ্বীপ’, ‘টারজান পয়েন্ট’, ‘মুরগি চত্বর’ ও ‘রাঙ্গামাটি’র বাইরেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা পরিচিত ‘লন্ডন ব্রিজ’, ‘মনপুরা দ্বীপ’, ‘বৃন্দাবন’ ও ‘লাভ ল্যান্ড’ নামে। এসব নামের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। কে বা কারা, কখন নামগুলো চালু করেছেন, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
তবে নামগুলোর মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসের অনানুষ্ঠানিক জীবন, শিক্ষার্থীদের রসবোধ এবং কোনো কোনো স্থানের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। একটি জায়গা শুধু তার ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে পরিচিত হয় না; মানুষের স্মৃতি, গল্প ও ব্যবহারও সেই জায়গার পরিচয় গড়ে তোলে। জাহাঙ্গীরনগরের এই নামগুলো তারই উদাহরণ।
প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে রয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছেন।
১৯৯৮ সালে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা মানিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালে তাদের পুনরায় বিতাড়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এই আন্দোলন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এসব আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী ভূমিকা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে তুলে ধরে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে মানুষের আকর্ষণের কারণ শুধু এর সবুজ প্রকৃতি, লেক কিংবা শীতের অতিথি পাখি নয়। শিক্ষা ও গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও এর পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। আর ক্যাম্পাসের বিচিত্র নামের জায়গাগুলো সেই পরিচয়ে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। ‘সুইজারল্যান্ড’ থেকে ‘ময়না দ্বীপ’, ‘টারজান পয়েন্ট’ থেকে ‘মুরগি চত্বর’ প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে স্থানীয় পরিচিতি, কল্পনা কিংবা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের কোনো না কোনো ছাপ।
ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক মানচিত্রে এসব নাম না থাকলেও শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ও কথোপকথনে জায়গাগুলো বেঁচে থাকে। তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে চিনতে হলে শুধু এর পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলো দেখলেই হয় না; ঘুরে দেখতে হয় সেই জায়গাগুলোও, যেগুলোর পরিচয় গড়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের দেওয়া নাম আর গল্পের মধ্য দিয়ে।
সময়ের আলো/জোই