মাজারে ভক্তের ভিড়, নেই ইসমাঈল গাজীর পরিচিতি

সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো

সারাদেশ

রংপুরের পীরগঞ্জে শাহ ইসমাঈল গাজীর (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত চারটি দরগা রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। এসব দরগায় প্রতিদিনই আসেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থী।

2026-10-31T08:55:33+00:00
2026-10-31T08:55:33+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
মাজারে ভক্তের ভিড়, নেই ইসমাঈল গাজীর পরিচিতি
সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৫ এএম 
মাজারে ভক্তের ভিড়, নেই ইসমাঈল গাজীর পরিচিতি
রংপুরের পীরগঞ্জে শাহ ইসমাঈল গাজীর (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত চারটি দরগা রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। এসব দরগায় প্রতিদিনই আসেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থী। কেউ শ্রদ্ধা জানাতে, কেউ মানত করতে, আবার কেউ আসেন দোয়া করতে। মুসলমানদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও দেখা যায় সেখানে। তবে যাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এত মানুষের আগমন, সেই শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবন, সাধনা ও ইতিহাস সম্পর্কে দর্শনার্থীদের জানার সুযোগ খুবই সীমিত।

দরগাগুলোতে দান ও মানতের ব্যবস্থা থাকলেও নেই পর্যাপ্ত পরিচিতিমূলক তথ্য। কোথাও চোখে পড়ে না ইতিহাস তুলে ধরার মতো তথ্যফলক, সাইনবোর্ড কিংবা ব্যানার। এমনকি দরগার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেও শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের গেজেটভুক্ত দুটি দরগার ক্ষেত্রেও ইতিহাস সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের তথ্য দেওয়ার উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পীরগঞ্জ উপজেলায় শাহ ইসমাঈল গাজীর স্মৃতিবিজড়িত চারটি দরগা রয়েছে। এর মধ্যে রংপুর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে বড়দরগা ইউনিয়নে অবস্থিত দরগাটি স্থানীয়ভাবে ‘বড়দরগা’ নামে পরিচিত।


গত ১২ বছর ধরে দরগাটির দেখাশোনা করছেন খাদেম মো. মোখলেছার রহমান। তার পরিবার বংশপরম্পরায় এ দায়িত্ব পালন করে আসছে। মোখলেছার রহমান জানান, তার দাদা খেতাব উদ্দীন বেগের আগে তার দাদার বাবা নয়া মিয়া বেগ দরগাটির পরিচর্যা করতেন। পরে তার বাবা আজিজুল্লাহ বেগ দায়িত্ব পালন করেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি সেই দায়িত্ব নেন। বর্তমানে খাদেমের পাশাপাশি দরগা পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। তার ভাষ্য, বড়দরগাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের গেজেটভুক্ত হয়েছে।

তবে দরগা প্রাঙ্গণে শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানার মতো কোনো তথ্যফলক বা পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড নেই। ফলে দর্শনার্থীরা তার সময়কাল, সাধনা কিংবা ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন না। খাদেম ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোখলেছার রহমানের কাছে তার জীবনী জানতে চাইলেও দু-একটি তথ্যের বেশি পাওয়া যায়নি। মোখলেছার রহমানের দাবি, শাহ ইসমাঈল গাজীর দেহ এ দরগাতেই শায়িত রয়েছে।

ইতিহাস সম্পর্কে সীমিত তথ্য থাকলেও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে দরগাটির গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মমতাজ মিয়া বলেন, এখানে যিনি শায়িত আছেন, তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল বলে মানুষের বিশ্বাস। দরগায় মানত করে অনেকে উপকার পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানান। এ বিশ্বাস থেকেই প্রতিদিন দর্শনার্থীরা আসেন।

মমতাজ মিয়ার মতে, দরগাটির যথাযথ সংস্কার ও পরিবেশের উন্নয়ন করা হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় মানুষ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও ভালো পরিবেশে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ পাবেন। একই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন পীরগঞ্জের ২০ মাইল ডাসারপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় আরও অনেকে।

পীরগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে চতরা এলাকায় রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত কাঁটাদুয়ার দরগা। এর দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সৈয়দ হাসান হাবিব লিটু। তার বাবা সৈয়দ আব্দুল মাবুদ মিয়ার মৃত্যুর পর তার ভাই সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন দরগার খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার অনুপস্থিতিতে দেখাশোনার দায়িত্ব সামলান সৈয়দ হাসান হাবিব লিটু।

কাঁটাদুয়ার দরগাটিও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত। তবে সেখানেও নেই পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড কিংবা শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনী। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেও দরগাটির ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

এমন সময় ভ্যানে করে কয়েকজন দর্শনার্থী দরগায় আসেন। কেন এসেছেন জানতে চাইলে ভ্যানচালক লাভলু জানান, পাশের এলাকায় বেড়াতে এসে মাজারটির কথা শুনেছেন তারা। তাই দোয়া করতে এসেছেন। তবে এটি কার মাজার, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। লাভলুর ভাষ্য, তাকে শুধু বলা হয়েছিল, এখানে একটি মাজার রয়েছে, সেখানে নিয়ে যেতে।


শাহ ইসমাঈল গাজীর ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরেন চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রব প্রধান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শাহ ইসমাঈল গাজী (রহ.) ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ঘোড়াঘাটের হিন্দু প্রশাসক ভান্দুসী রায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন। অভিযোগ করা হয়, তিনি কামরূপের রাজার সঙ্গে মিলে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।

এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দমনে সৈন্য পাঠানো হয়। কথিত আছে, ১৪৭৪ সালের অক্টোবরে কাঁটাদুয়ারে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও কাটাকাটির ঘটনা থেকেই স্থানটির নাম হয়েছে কাঁটাদুয়ার।

অধ্যক্ষ আব্দুর রব প্রধান আরও জানান, শাহ ইসমাঈল গাজীর মৃত্যুর পর সুলতান রুকনুদ্দীন বরবক শাহ ও তার স্ত্রী স্বপ্নে তার অন্যায়ভাবে শিরশ্ছেদের বিষয়টি জানতে পারেন। এতে অনুতপ্ত হয়ে তারা সৈন্য, হাতি ও ঘোড়াসহ চতরা, কাঁটাদুয়ার, বড়বিলা ও বড়দরগা এলাকায় আসেন। জনশ্রুতি রয়েছে, এ সময় শাহ ইসমাঈল গাজীর মাজারের জন্য তারা খাজনামুক্ত জমি দান করেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রংপুর বিভাগের ফিল্ড অফিসার মো. আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল বলেন, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগা ও কাঁটাদুয়ার প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত। শাহ ইসমাঈল গাজীর স্মৃতিবিজড়িত চারটি দরগা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিহাস না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, পীরগঞ্জের সীমান্তে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এবং হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় ও দিনাজপুর শহরের মাঝামাঝি আরও দুটি দরগা রয়েছে।

তিনি বলেন, গেজেটভুক্ত পুরাকীর্তিগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের। এগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। দরগাগুলোতে তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, সেখানে তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড রয়েছে।

ইতিহাসে শাহ ইসমাঈল গাজী
শাহ ইসমাঈল গাজী (রহ.) ছিলেন সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রি.) আমলের একজন দরবেশ যোদ্ধা। ফারসি পাণ্ডুলিপি ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত লোককাহিনিতে তার আধ্যাত্মিক গৌরব ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। ‘রিসালাত-উস-শুহাদা’ নামের একটি ফারসি পাণ্ডুলিপি ১০৪২ হিজরি বা ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে পীর মুহম্মদ সত্তরী রচনা করেন। এতে বাংলায় শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবন ও কর্মের বিবরণ রয়েছে।

পাণ্ডুলিপির বর্ণনা অনুযায়ী, শাহ ইসমাঈল গাজী ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর। তার জন্ম মক্কায়। সেখানেই বেড়ে ওঠার পর তিনি শিক্ষকতা ও ধর্মপ্রচারে যুক্ত হন। জীবনের একপর্যায়ে তার মধ্যে শহিদ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কয়েকজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন। একপর্যায়ে পৌঁছান লখনৌতে।

সে সময় বাংলার রাজধানী প্রতিবছর বন্যায় প্লাবিত হতো। বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ তার প্রকৌশলী ও কারিগরদের নিয়োগ করেও সফল হননি। পরে শাহ ইসমাঈল গাজী সুলতানকে রাজধানীর পাশের ছুটিয়া-পুটিয়া নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেন। এর ফলে শহরটি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পায়। এ ঘটনায় সুলতানের অনুগ্রহ লাভ করেন তিনি। পরে বিভিন্ন সীমান্তে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বও পান। এভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে এগিয়ে যান এই দরবেশ।

প্রথমে বাংলার দক্ষিণ সীমান্তে ওড়িশার রাজা গজপতির আগ্রাসী পরিকল্পনা মোকাবিলার দায়িত্ব পান শাহ ইসমাঈল গাজী। তিনি গজপতিকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে সীমান্ত ফাঁড়ি মান্দারণ দখল করেন। পরে তাকে কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। কামেশ্বর পরাজিত হয়ে সুলতানকে কর দিতে বাধ্য হন।

তবে অল্পদিনের মধ্যেই ঘোড়াঘাট সীমান্ত ফাঁড়ির সেনাপতি ভাণ্ডাসী রায় তার জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি সুলতানের কাছে অভিযোগ করেন, শাহ ইসমাঈল গাজী কামরূপের রাজার সহযোগিতায় নিজের জন্য স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছেন। এ অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে সুলতান দরবেশের শিরশ্ছেদের আদেশ দেন।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   মাজারে ভক্ত  ভিড়  ইসমাঈল গাজী  রংপুর  পীরগঞ্জ  শাহ ইসমাঈল গাজীর (রহ.)  দরগা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: