ছবি : সংগৃহীততথ্য প্রযুক্তি বা আইটি খাতে দিনকে দিন চাহিদা বাড়ছে অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশ জাপানে। বর্তমান সরকার প্রচুর জনবল আমদানি করছে অধুনা গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে। কিন্তু বাংলাদেশ সেটি লুফে নিতে পারছে না। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারত নেপাল ভিয়েতনাম এ যাত্রায় বেশ এগিয়ে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে আইটি খাতে জনবল পাঠাতে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাপানে প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন। যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার রয়েছেন শিক্ষার্থী হিসেবে যারা জাপানি ভাষা কোর্স বা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ শেষে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। আর আইটি ইঞ্জিনিয়ার আছেন হাজারখানেক।
জাপান সফরে সরেজমিনে জানা যায়, জাপানের জনসংখ্যা দ্রুত হ্্রাস পাচ্ছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই তীব্র শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণ করতে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজকর্ম পরিচালনা করতে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো তথ্য প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।
দেশটির সরকার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার নাম ‘সোসাইটি ৫.০।’ এর মূল লক্ষ হলো সাইবার স্পেস (ভার্চুয়াল জগৎ) এবং ফিজিক্যাল স্পেসের (বাস্তব জগৎ) মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি মানবকেন্দ্রিক সমাজ গঠন করা, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও পরিবহন খাত সম্পূর্ণ আইটিভিত্তিক হবে।
অর্থাৎ জাপান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রচুর কর্মী চায় প্রযুক্তি খাতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, ক্লাউড টেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো প্রযুক্তিগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার আইটি কর্মীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানের বা ইংরেজি জানা কর্মীদের জন্য জাপানে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিতে সাধারণত বার্ষিক ৬ মিলিয়ন থেকে ২০ মিলিয়ন ইয়েন বা তার বেশি বেতনের সুযোগ থাকে। অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত বার্ষিক বেতন ৪ মিলিয়ন থেকে ২০ মিলিয়ন ইয়েন বা তার বেশি হয়ে থাকে। যেমন— জুনিয়র বা মিড-লেভেল আইটি সাপোর্ট-স্পেশালিস্টদের বেতন বার্ষিক ৪ থেকে ৭.৫ মিলিয়ন ইয়েন এবং সিনিয়র বা স্পেশালাইজড এআই-প্রোডাক্ট ম্যানেজারদের বেতন ৭ থেকে ১২+ মিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত হয়।
ঞড়শুড়উবা এবং ঔধঢ়ধহ উবা— এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ফুল-স্ট্যাক, ব্যাকঅ্যান্ড, এআই ও ডেভপস পদের জন্য বার্ষিক প্রায় ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ইয়েন বা তার বেশি বেতনের সুযোগ থাকে।
জাপান প্রবাসী মারিয়া রহমান স্বামীকে নিয়ে থাকেন রাজধানী টোকিও শহরে। ২০১৮ সালের জুলাই সেশনে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে জাপান আসেন তিনি। এখন একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে ভালো উপার্জন করছেন মারিয়া।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করে জাপানে আসি ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে। তবে আমি ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সটা জাপানে এসে কন্টিনিউ করছি মাত্র এক বছর। জাপানিজ ভাষার দ্বিতীয় স্তর এন টু শেষ করেছি। এরইমধ্যে জাপানিজ কোম্পানিতে আমার জব হয়ে যায়। তারপর ভিসা স্ট্যাটাস চেঞ্জ করে ফুলটাইম জবে ঢুকে গেছি।
মারিয়া বলেন, আমি প্রথম ফরেনার ছিলাম ওই কোম্পানিতে। এখন বেশ কয়েকজন আছেন, তবে অন্যদেশি।
মারিয়া জানান, তিনি আসার বছরতিনেক পর তার স্বামী আরিফুর রহমান জাপানে আসেন।
তিনি বলেন, আমার হাজব্যান্ড বাংলাদেশে আইটিতে জব করতেন। তিনি জাপানে আসেন ডিপেনডেন্ট ভিসায়, তবে চার মাস পরেই আইটি জবে ঢুকে যান তিনি। তার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বাংলাদেশের জব ফিল্ডে দুই আড়াই বছরের অভিজ্ঞতা ছিল। ওটা দিয়ে তিনি জাপানের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আইটিতে ৫ বছর ধরে জব করছে।
মারিয়া জানান, আইটির বেতন কাঠামো সাধারণত কোম্পানি এবং পদের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে। জাপানি ঐতিহ্যবাহী কোম্পানিগুলোতে বেতনের রেঞ্জ খুব বেশি হয় না। তবে বহুজাতিক (মাল্টিন্যাশনাল) কোম্পানিতে বেতন তুলনামূলকভাবে ভালো দেওয়া হয়। মাসিক ৪ থেকে ৫ লাখ ইয়েন বা তার বেশি এবং দক্ষ প্রার্থীরা আরও বেশি পেয়ে থাকেন। এখানে শুরুর দিকে স্যালারি প্রায় ২ লাখ ইয়েনের মতো হয়ে থাকে।
মারিয়া মনে করেন, জাপানি কোম্পানিতে ভালো কাজের সুযোগ পেতে হলে দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষা জানা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভাষা না জানলে ঐতিহ্যবাহী জাপানি কোম্পানিতে ঢোকা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে জাপানে অবস্থিত বিভিন্ন বহুজাতিক ও ফরেনার-ফ্রেন্ডলি কোম্পানি; রাকুতেন, পেপে এবং অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানে ভাষা কোনো বড় বাধা নয়। কারণ তারা বিদেশিদের সহজেই নিয়োগ দিয়ে থাকে।
তিন বছর ধরে জাপানে আছেন সাকিব হাসান। থাকেন টোকিওর ওহানাজায়াতে এলাকায়। তিনি অধ্যয়নরত। গ্র্যাজুয়েশন শেষে জাপানের আইটি সেক্টরে জব করাটাই আপাতত তার লক্ষ।
এর কারণ হিসেবে সাকিব বলেন, জাপানের গভর্নমেন্ট এবং জনগণ উভয়ই প্রযুক্তির ব্যাপারে খুবই আপ-টু-ডেট আর সিরিয়াস থাকে সবসময়। টেকনোলজির ব্যাপারে তারা কোনো কম্প্রোমাইজ করে না। তবে প্রথমে তারা যেকোনো প্রযুক্তিকে ডিপলি অবজার্ভ করে। এরপর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে টপমোস্ট প্রায়োরিটি দিয়ে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার এবং এর উন্নয়নে জোর প্রচেষ্টা চালায়। উদাহরণ হিসেবে অও কে দেখতে পারেন। বর্তমান দুনিয়ায় অও ধিাব -এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জাপান অও এ ব্যাপক বিনিয়োগ করছে এবং এর জন্য আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এসব বিষয়ে মনোযোগী হওয়া।
ত্রিশোর্ধ জাহিদুল ইসলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করেই জাপান চলে আসেন।
তিনি বলেন, টেকনোলজি সাবজেক্টের ওপর ডিপ্লোমা থাকলে জাপানে হিউজ আয় করা সম্ভব। এই সেক্টরে জব করে ১ মিলিয়ন বেতন পান ভারতের প্রবাসীরা। সেখানে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি।
এত সংকটের মধ্যেও জাইকা (ঔওঈঅ) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ-জাপান আইসিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ট্রেনিং প্রোগ্রাম (ই-ঔঊঞ) পরিচালিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশিদের জাপানি ভাষা এবং আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি জাপানের বাজারে চাকরির সুযোগ করে দিচ্ছে। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা নর্থ সাউথের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ইঞ্জিনিয়াররা সফটব্যাংক, এনটিটি, টয়োটা ও ফুজিৎসুর মতো বড় বড় জাপানি কোম্পানিতে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির নির্বাহী পরিচালক এম জে ফেরদৌস বলেন, জাপানের প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার। ২০১৮ সাল থেকে জাপানের বাজারে কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠান।
ফেরদৌসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাপান প্রতি বছর সফটওয়্যার সেবা বাইরে থেকে নেওয়ার জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ভিয়েতনাম একাই এই বাজারের আনুমানিক ৬ থেকে ৭ শতাংশ দখল করেছে। বাংলাদেশের অংশ এখনও সামান্য হওয়ায় প্রবৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
জাপানে আইটি খাতে সাধারণ বার্ষিক গড় বেতন প্রায় ৫.৪২ মিলিয়ন ইয়েন, যেখানে দেশীয় জাপানিজ কর্মীদের তুলনায় বিদেশি আইটি ইঞ্জিনিয়াররা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। চীন দক্ষিণ কোরিয়া ফিলিপাইন ভিয়েতনাম ভারত নেপালের প্রবাসীরা বেশ এগিয়ে।
মেহেদী হাসান মুন্না জাপান রেমিট ফাইন্যান্সে (জেআরএফ) আইটি সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, তিন বছর ধরে আমি জাপানে কাজ করছি। এখানে আসার পর দেখলাম আমাদের দেশের আইটি সেক্টর এবং জাপানের আইটি সেক্টর অনেক ডিফারেন্ট। এখানে কাজের স্কোপ অনেক বেশি। তাই প্রযুক্তিতে ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকলে হবে না। ভালো দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান সময়ের আলোকে বলেন, জাপানে আইটি এক্সপার্টের প্রচুর চাহিদা বাড়ছে। তারা এআই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারসহ এই বাজারে দক্ষ লোকবল চাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে পারে। যেখানে ইন্ডিয়া ভিয়েতনাম নেপাল প্রচুর আইটি এক্সপার্ট জাপানে পাঠাচ্ছে। তারা কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্থ উপার্জন করছে। সেখানে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে জাপানের চাহিদা অনুযায়ী যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা দৈনিক সময়ের আলোর কাছে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের বর্তমান পরিস্থিতি, সম্ভাবনা এবং সচেতনতার নানা দিক তুলে ধরেন।
জাপানের শ্রমবাজারে উদীয়মান দক্ষতার চাহিদার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, জাপান সরকার বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান ‘রাকুটেন’সহ বিভিন্ন খ্যাতনামা সংস্থায় সহস্রাধিক বাংলাদেশি আইটি প্রকৌশলী সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে আইটি ও অন্যান্য দক্ষ খাতে আরও বেশি বাংলাদেশি পেশাজীবী যুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির সময়ের আলোকে বলেন, সরকারকে একটি প্রচার চালানো উচিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাপান দূতাবাসে ‘জাপান সেল’ নামে একটি তথ্যসেবামূলক কেন্দ্র খোলে। যার মাধ্যমে সরকার প্রচার কার্যক্রম জোরদার করতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে