বিনিয়োগের আশ্বাস বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

রফিক রাফি টোকিও (জাপান) থেকে

জাতীয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। সফরে ৬

2026-11-01T05:25:11+00:00
2026-11-01T05:25:11+00:00
 
  রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর
বিনিয়োগের আশ্বাস বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
প্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত
রফিক রাফি টোকিও (জাপান) থেকে
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:২৫ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। সফরে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের আশ্বাস এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আশাবাদী জাপানপ্রবাসী ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

জাপানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশিদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক বহু পুরোনো হলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এখনও অনেক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বাকি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর পথ আরও প্রসারিত হয়েছে। তবে বিনিয়োগের আশ্বাস বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা।

সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিসহ দেশটির সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জাপানের নাগোয়া শহরে বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার প্রধান কারখানা ও সংযোজন প্লান্ট পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রথম প্রাইভেট কারও দেখেন।

এদিকে শুক্রবার টোকিওতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা ও সহকারী অর্থমন্ত্রী আতসুসি মিমুরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে উভয় পক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়।


ইপিএ চুক্তিতে রফতানি বাড়ানোর সুযোগ : জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে দেশটির বড় বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও সহজ হতে পারে। 

ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার পাশাপাশি এর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দূতাবাসের মতে, ইপিএর সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের চুক্তির শর্ত, শুল্কসুবিধা এবং পণ্যের উৎপত্তি সংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা জাপানের বাজারে আরও ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।

জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানির বড় সম্ভাবনা

জাপানে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিজিএমইএর উপদেষ্টা কাজী সারওয়ার হাবিব। তিনি ১৪ বার এনআরবি-সিআইপি সম্মাননা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন একটি পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপানের পোশাক বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক। প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে জাপান। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করেও দেশটির বাজারে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করতে পেরেছে।

কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, এ বছর বিজিএমইএতে জাপান ডেস্ক চালু হয়েছে। বিজিএমইএর ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জাপানি রাষ্ট্রদূত সংগঠনটির কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন। জাপানের পক্ষ থেকে আগামীতে বাংলাদেশ থেকে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনার সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ইপিএর আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৩৯৮টি পণ্য বা বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ৯৮ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

বিনিয়োগের আশ্বাস বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপির চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপলুর মতে, উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরের মধ্য দিয়ে নতুন যেসব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সুফল পেতে হলে চুক্তি ও বিনিয়োগের আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা জরুরি। শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেলেই হবে না, সেগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

জাপান বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাপান স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান জনি সময়ের আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে হবে।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে

জাপানপ্রবাসী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার এবং জাপান রেমিট ফাইন্যান্স (জেআরএফ) গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হোসেইন মো. সারোয়ার সানিও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো হলেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। জাপানি বিনিয়োগকারীরা মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ করেন। দেশ দুটি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রচার ও জনসংযোগ কার্যক্রমে অনেক বেশি সক্রিয়।

সারোয়ার সানির মতে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কিছু সমস্যা থাকলেও পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে দেশকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস ও কাজ করার সুবাদে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে জাপানিদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত জাপানে বিনিয়োগবিষয়ক সেমিনার ও প্রচার কার্যক্রম বাড়ানো, দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় করা এবং জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান বাংলাদেশে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া।

সব মিলিয়ে তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বিনিয়োগের আশ্বাস, চুক্তি ও সমঝোতাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলেই এই সফরের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে। জাপানের বাজারে রফতানি বাড়ানো, নতুন শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন প্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   বিনিয়োগের আশ্বাস বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ প্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: