তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ ঘোষণা দেবেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার সকালেও মিরপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর পল্টনে শ্রম ভবনে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি সরকার এবং মালিকদের দুই সংগঠনই মেনে নিয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে বোর্ডের জন্য তাদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দিয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আলোচনা করেন শ্রমমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের কর্মকর্তারা। ওই আলোচনায় শ্রমিকদের দাবির বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়।
নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধি থাকবেন। তিন পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণের পর শ্রম মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করে নতুন মজুরি ও কার্যকরের তারিখ জানাবে। শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
বেতন পরিশোধে মালিকদের তাগিদ
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেসব কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা বকেয়া রয়েছে, সেগুলো দ্রুত পরিশোধের জন্য বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের বিষয়েও মালিকপক্ষের সংগঠন দুটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। সংগঠনগুলোর নেতারা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নেবেন।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মালিকপক্ষ অর্থ পাবে না, ফলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আন্দোলনে বহিরাগতদের ইন্ধনের অভিযোগ
শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শ্রমমন্ত্রী দাবি করেন, এসব ঘটনায় সাধারণ শ্রমিকেরা জড়িত নন। তার অভিযোগ, কিছু বহিরাগত রাজনৈতিক গোষ্ঠী শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্যে আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে। কারখানার ভেতরে শ্রমিকেরা কাজ করলেও বাইরে থেকে কিছু লোক গিয়ে তাদের উত্তেজিত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার সংঘাত চায় না; আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে চায়। তবে শিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমান ও রেজওয়ান সেলিম উপস্থিত ছিলেন।
শতাধিক কারখানায় ছুটি
এদিকে চলমান শ্রমিক অসন্তোষে মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা শিল্প এলাকায় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি তৌহিদুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, এসব কারখানার শ্রমিকেরা গতকাল দুপুরের পর আর কাজে যোগ দেননি।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তৌহিদুর রহমান বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে বাড়িভাড়াও। এমন পরিস্থিতিতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে পরিবার নিয়ে চলা শ্রমিকদের জন্য কঠিন। এ কারণে তারা নতুন মজুরি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ পোশাকশিল্পে নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরের মাস থেকে এ হারে বেতন পাচ্ছেন শ্রমিকেরা। আগে প্রতি পাঁচ বছর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের বিধান ছিল। তবে গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধনীতে এ সময়সীমা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। সেই হিসাবে চলতি নভেম্বরেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সময় হয়েছে।