আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ, ভোগান্তি

আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি

সারাদেশ

বগুড়ার আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুস ছাড়া কোনো সেবা মেলে না বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর

2026-11-03T18:24:55+00:00
2026-11-03T18:24:55+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ, ভোগান্তি
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:২৪ পিএম 
বগুড়ার আদমদীঘি ভূমি অফিস। ছবি : সংগৃহীত
বগুড়ার আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুস ছাড়া কোনো সেবা মেলে না বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে তাদের। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে উল্টো নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি একজন সেবাগ্রহীতা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি; বরং তাকে অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে নামজারি আবেদন, খতিয়ান সংশোধন ও মিস কেসের জন্য অতিরিক্ত টাকা না দিলে সেবা মিলছে না, যার ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ব্যাঘাত ঘটছে। সম্প্রতি চাঁপাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুস লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তবে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম সরাসরি সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ফাইল নিয়ে কানুনগোর মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা রয়েছে। এর মধ্যে আদমদীঘি সদর, ছাতিয়ানগ্রাম, সান্তাহার, কুন্দগ্রাম, চাঁপাপুর ও নশরতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায়ের প্রতিটি ধাপে টাকা দিতে হয়। হাতে গোনা কয়েকটি ভূমি অফিস ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই ভূমি উন্নয়ন করের আবেদন করার পর সেবাগ্রহীতাদের দিন পার করতে হয়। বর্তমান এসিল্যান্ড আশরাফুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে কৌশল পাল্টেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের প্রতিটি আবেদন সরাসরি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এবং কিছু চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে এসিল্যান্ড অফিসের কানুনগো আসাদুল ইসলামের হাতে জমা নেওয়া হয়। আর সেখানেই চলে ঘুস লেনদেন। যারা নিজে নামজারি বা খতিয়ান সংশোধনের আবেদন করেন, তাদের সেবা পেতে চরম বিলম্ব হয়। তহশিলদার বা চিহ্নিত দালালদের মাধ্যমে আবেদন করে কানুনগোর নিকট নথি জমা দিলেই কেবল দ্রুত কাজ হয়। এমনকি তাদের মাধ্যমে নথি জমা দিলে কোনো কেসের শুনানিরও প্রয়োজন হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা জানান, তারা সরাসরি ভূমি অফিসে কাজে গেলে কেউ কোনো কথাই শোনেন না। অথচ সেই কাজ দালাল বা সংশ্লিষ্ট সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকাসহ জমা দিলে দ্রুত সম্পন্ন হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা কি ঘুস ছাড়া ভূমি সেবা পাব না?

সানাউল হক নামের এক ভুক্তভোগী জানান, জিনরী মৌজায় তার খালার দুটি আরএস খতিয়ান সংশোধনের জন্য প্রথমে তিনি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করেন। দীর্ঘদিন অফিসের বারান্দায় ঘুরেও কাজ হয়নি। বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম যোগদানের পর অফিসের কানুনগো আসাদুল ইসলাম তাকে অনলাইনে আবেদন করতে বলেন। অনলাইন আবেদনের পর প্রায় দুই মাস তহশিল ও এসিল্যান্ড অফিসের বারান্দায় ঘুরে কানুনগোর দেখা পান তিনি। তখন কানুনগো আসাদুল ইসলাম খতিয়ান দুটি সংশোধন বাবদ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। নিরুপায় হয়ে তিনি সেই টাকা দেন। এরপর একটি খতিয়ান সংশোধন হলেও অন্যটিতে সার্ভার জটিলতা থাকায় বগুড়া ডিসি অফিসে গিয়ে তা ঠিক করতে হয়। গত মাসের ৪ অক্টোবর অতিরিক্ত ঘুস গ্রহণের প্রতিকার চেয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করলেও তার কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সদরের কুসুম্বী গ্রামের ভুক্তভোগী ময়েন উদ্দিন ও আলম হোসেন জানান, অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া এসব ভূমি অফিসে কোনো ফাইল নড়ে না। তারা বলেন, খতিয়ান সংশোধনের জন্য আট মাস ধরে তারা দিনের পর দিন আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুরেও কাজ পাননি; বরং তাদের নথিও কয়েক দফায় হারিয়ে ফেলা হয়েছে। তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তারা ভেবেছিলেন ফ্যাসিবাদের আমল শেষ হওয়ায় অনলাইনভিত্তিক সব কাজ সহজ হবে, কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। এই হয়রানির প্রতিকার চেয়ে তারা গত ১ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

সদরের তেঁতুলিয়া গ্রামের মুকুল হোসেন জানান, পূর্বের এসিল্যান্ড মাহমুদা সুলতানা দায়িত্বে থাকার সময় তিনি বাইরের দোকান থেকে নিজের ও পরিবারের নামে অনলাইনে নামজারি আবেদন করেন। তখন সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার আসলাম আলী জিন্নাহর কাছে প্রস্তাবের জন্য গেলে তিনি ৪টি নামজারির প্রস্তাব বাবদ ৮ হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন। প্রতিবাদ করায় তহশিলদার তাকে নানাভাবে হয়রানি করেন এবং তৎকালীন এসিল্যান্ড মাহমুদা সুলতানা তাকে ডেকে ভয়ভীতি দেখান। মনের দুঃখে তিনি আর নামজারির জন্য নতুন করে আবেদন করেননি।

আদমদীঘি সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রেগে গিয়ে বলেন, ‘এ মিয়া, যার কাছে অভিযোগ করেছেন তার সাথেই কথা বলুন।’ এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম জানান, ঘুস লেনদেনের বিষয়টি তার জানা নেই। তবে ঘটনা সত্য হলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সানাউল হক নামের এক সেবাগ্রহীতার লিখিত অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, যতদূর জেনেছেন ভুল বোঝাবুঝির কারণে তিনি অভিযোগ দিয়েছিলেন, পরে কী হয়েছে তা তার জানা নেই। এছাড়া রোববার (১ নভেম্বর) দুটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   বগুড়া  আদমদীঘি  ভূমি অফিস  ঘুস  অভিযোগ  সেবাগ্রহীতা  অর্থ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: