ই-রিকশায় শৃঙ্খলা বাড়বে কতটা

সমীরণ রায়

জাতীয়

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার দৌরাত্ম্য কমিয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ইতিমধ্যে

2026-11-04T00:37:36+00:00
2026-11-04T00:37:36+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
নির্ধারিত সংখ্যা ছাড়াই নিবন্ধন
ই-রিকশায় শৃঙ্খলা বাড়বে কতটা
সমীরণ রায়
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম 
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার দৌরাত্ম্য কমিয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ইতিমধ্যে নগর ভবন ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে আবেদন ফরম বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারের নতুন বিধিমালায় নিবন্ধন, কারিগরি মান, চলাচলের রুট, গতিসীমা ও যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে নিবন্ধনের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, নাকি বৈধতার সুযোগে ই-রিকশার সংখ্যা ও দৌরাত্ম্য আরও বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগই নতুন বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে ঢাকায় অন্তত ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয়। এসব যানবাহনের মধ্যে কতটি নিবন্ধনের যোগ্য হবে, সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী কতটি চলতে পারবে এবং বাকিগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ঢাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে ভিন্ন রঙের ই-রিকশা চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে এক এলাকার গাড়ি অন্য এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে।

তবে শুধু জোন নির্ধারণ করলেই শৃঙ্খলা ফিরবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর অলিগলি থেকে ই-রিকশা প্রায়ই প্রধান সড়কে উঠে আসে। কোথাও বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ই-রিকশা একই সড়কে চলাচল করে। নির্ধারিত রুটে চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

নগরবাসীর অভিযোগ, অলিগলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক— সবখানেই ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচলে যানজট বাড়ছে। বেপরোয়া গতি, হঠাৎ মোড় নেওয়া, ফুটপাথ দখল ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে পথচারী ও অন্য যানবাহনের চালকরা ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই ই-রিকশাকে নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও শুধু নিবন্ধনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মঙ্গলবার থেকে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএসসিসি। প্রতিটি আবেদন ফরমের মূল্য ১০০ টাকা। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নগর ভবন ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে ফরম সংগ্রহ করা যাবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি ফরম নিতে পারবেন। ডিএসসিসি এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

কাল ৫ নভেম্বর ডিএসসিসি ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথসভায় জোনের সীমানা এবং প্রতিটি অঞ্চলে সম্ভাব্য যানবাহনের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ফরম সংগ্রহ করলেই চলাচলের অনুমতি মিলবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ফরম সংগ্রহ ও পূরণ করতে আসা চালক-মালিকদের ভিড়ে নগর ভবনে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, একবারে সব অটোরিকশা বন্ধ করা সম্ভব নয়। হঠাৎ বন্ধ না করে ধাপে ধাপে এগুলোকে নিয়ম ও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার, ২ হাজার কিংবা ৫০০— যতগুলো ই-রিকশা শর্ত পূরণ করবে, সেগুলোকে নিবন্ধনের অনুমোদন দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ফরম সংগ্রহ করলেই সড়কে চলাচলের অনুমতি পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুসরণ করে যানবাহন তৈরি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদন বা কারিগরি ছাড়পত্র নিতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে। নির্ধারিত মডেলের যানবাহন তৈরি ও মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধে ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত না হলে সুফল পাওয়া কঠিন।

নিবন্ধনের আগে সংখ্যা নির্ধারণের প্রশ্ন : নতুন ব্যবস্থায় একজন জাতীয় পরিচয়পত্রধারীর নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। ফলে একজন মালিকের নামে একাধিক যানবাহন নিবন্ধিত হতে পারবে। অন্যদিকে একাধিক ব্যক্তি নিবন্ধন নিলে মোট যানবাহনের সংখ্যা কত দাঁড়াবে, তা আগে নির্ধারণ না করা হলে নিবন্ধনই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

নতুন বিধিমালায় সিটি করপোরেশনগুলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ডিএসসিসি এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আগে সংখ্যা নির্ধারণ করে পরে নিবন্ধন, নাকি আগে নিবন্ধন দিয়ে পরে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ— এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিধিমালায় জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক ও নির্ধারিত নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চলাচলে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফুটপাথেও এসব যান চলতে পারবে না। কিন্তু কোন সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ, কোথায় চলবে এবং কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না হলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে।
চালকের দক্ষতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুরুতেই সব চালককে লাইসেন্সের আওতায় আনা হচ্ছে না। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক চালকের আবেদন একসঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ কঠিন হওয়ায় প্রথমে যানবাহন নিবন্ধনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চালকদের লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা হবে। এতে নিবন্ধিত যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে চালকের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পরিচয় কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যানবাহনের কারিগরি মান যাচাইয়ের পাশাপাশি চালকের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিবন্ধন ফি নিয়ে অসন্তোষ : নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং চার যাত্রীর ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা। এ ছাড়া ফিটনেস সনদের জন্য এক হাজার এবং নম্বর প্লেটের জন্য অতিরিক্ত এক হাজার টাকা দিতে হবে। নিবন্ধিত যানবাহনে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক দেওয়ার বিধান রয়েছে।

দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অনেক চালকের পক্ষে একসঙ্গে এই অর্থ জোগাড় করা কঠিন হতে পারে। ফলে ফি বেশি হলে প্রকৃত চালক ও মালিকদের একটি অংশ নিবন্ধনের বাইরে থেকে যেতে পারেন। নিবন্ধনের পরও গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন, মেরামত ও চার্জিংয়ে বাড়তি খরচ রয়েছে। এসব কারণে অনেকে নিবন্ধন এড়িয়ে চললে অনিবন্ধিত যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা কঠিন হবে।

এদিকে ই-রিকশার জন্য বিধিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ। তবে বিধিমালার কয়েকটি বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বিদ্যমান যানবাহনের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য অন্তত দুই বছর সময় দেওয়া, নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কমানো, চালকের লাইসেন্সের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।

তাদের বক্তব্য, কাঠামোগত পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে বর্তমানে চলাচলরত বহু যানবাহন নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। চালকের লাইসেন্সের ব্যবস্থা পিছিয়ে দিলে পরিচয় যাচাইয়ে অনিয়ম, হয়রানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও বাড়তে পারে। কোন সড়কে ই-রিকশা চলবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা। এসব দাবিতে আগামী ১১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ১৩টি সিটি করপোরেশনে সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।

রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, ই-রিকশা নিবন্ধন সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে ফরম বিতরণ বা ফি আদায়ের ওপর নয়; বরং কতটি যানবাহন চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে, চালকরা কতটা প্রশিক্ষিত, কোন সড়কে গাড়ি চলছে এবং বিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন এসব বিষয় নিশ্চিত করতে না পারলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগই নতুন বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে।

নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের রুট ও কারিগরি মান নির্ধারণের পাশাপাশি চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, নির্দিষ্ট পার্কিং, নিরাপদ চার্জিং এবং অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিবন্ধনের আগে সড়কের ধারণক্ষমতা ও গণপরিবহনের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ করা। তা না হলে নিবন্ধিত ই-রিকশার সংখ্যা বাড়লেও যানজট, দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা কমবে না।

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ই-রিকশাকে বিধিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন, চলাচলের রুট, সর্বোচ্চ গতি, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান বাস চলাচলের সড়কে এসব যান চলতে পারবে না। সরকারের আশা, নিয়ম মেনে চলাচল নিশ্চিত করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   ই-রিকশা  শৃঙ্খলা  নির্ধারিত সংখ্যা  নিবন্ধন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: