মুড়িমুড়কির মতো ফুটছে গুলি

আদিল সরকার

জাতীয়

একসময় অপরাধজগতের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল গুলি করে হত্যা। এখন বাংলাদেশে সেই গুলিই যেন অপরাধ সংঘটনের প্রথম ও প্রধান মাধ্যম হয়ে

2026-11-04T00:48:00+00:00
2026-11-04T00:49:09+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
মুড়িমুড়কির মতো ফুটছে গুলি
আদিল সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৮ এএম  আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ১২:৪৯ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একসময় অপরাধজগতের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল গুলি করে হত্যা। এখন বাংলাদেশে সেই গুলিই যেন অপরাধ সংঘটনের প্রথম ও প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতা ও অর্থের দ্বন্দ্ব, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি কিংবা আধিপত্য বিস্তার— বিরোধের নিষ্পত্তি হচ্ছে পিস্তলের গুলিতে। সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের হাতে পিস্তলের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, তুচ্ছ বিরোধ কিংবা সামান্য আধিপত্যের লড়াইয়েও মুহূর্তে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল— যখন-তখন প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ঘটছে, গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে। ছোট আকারের হওয়ায় সহজে বহন ও গোপন করা যায় বলে অপরাধীদের কাছে পিস্তল হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র। কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পেশাদার সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে ছড়িয়ে পড়ছে এসব আগ্নেয়াস্ত্র।

অন্যদিকে সিনেমা ও সিরিয়ালে অপরাধ সংঘটনের কৌশল, খুনের পরিকল্পনা, পুলিশের অভিযান এড়ানোর পদ্ধতি ও নানা গোপন তৎপরতা যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা অপরাধীদের নতুন নতুন কৌশল শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। সীমান্তপথে আসা বিদেশি অস্ত্রের পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে অপরাধীদের হাতে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানেও থামছে না অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— কোথা থেকে আসছে এসব অস্ত্র, কারা জোগান দিচ্ছে এবং কারা নিয়ন্ত্রণ করছে অস্ত্রের বড় সিন্ডিকেট? গুলিতে আতঙ্ক, হত্যায় মুড়িমুড়কির মতো পিস্তলের ব্যবহার : গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার ‘নিউ গিনি প্রপার্টিজ’ নামের একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা চালায় প্রায় একশ থেকে দেড়শ সশস্ত্র সন্ত্রাসী। 

ওই দিন রাতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এলাকায় প্রবেশ করে তারা। আতঙ্ক ছড়াতে প্রায় ৫০ রাউন্ড এবং অফিসের মূল ফটকের দিকে আরও ১০ রাউন্ডের মতো গুলি ছোড়ে। তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারীদের হাতে পিস্তল, শটগান, রিভলবার, চাপাতি ও রামদার মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ছিল।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে একটি সেলুনে ফরহাদ হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১২ জুন রাজধানীর রামপুরা-হাতিরঝিল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তার মৃত্যু হয়। একই দিন খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গত ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনার দুর্গাপুরে চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়। পরদিনও আরেকটি গুলিতে হত্যার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডেও গুলি করে হত্যার খবর আসে। 

এর আগে ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন। এসব ঘটনা রাজনৈতিক বিরোধ, অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব ও আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহারের ঝুঁকিকে সামনে এনেছে।

সাত মাসে ১২৩ গুলির ঘটনা : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে অন্তত ১২৩টি গুলিবর্ষণের ঘটনায় ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। তবে সব হত্যা মামলায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। এ সময়ে দেশে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জনই হামলাকারীদের গুলি ও আক্রমণে মারা গেছেন। এ ছাড়া শুধু অক্টোবর মাসে ৩১ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

পাঁচ সীমান্ত রেড জোন, উদ্ধার হয়নি লুটের অস্ত্র : গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সিলেট, বান্দরবান ও সাতক্ষীরাসহ দেশের পাঁচটি সীমান্ত এলাকা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত। এসব রুট দিয়ে অবাধে অস্ত্র প্রবেশের তথ্য রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট কারখানা গড়ে তুলে অস্ত্র তৈরির তথ্যও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত অঞ্চল থেকে আসা বড় অস্ত্রের জোগানও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বিভিন্ন থানা, পুলিশের স্থাপনা ও জেলখানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩ রাউন্ড গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার হয়নি। ফলে লুটের অস্ত্র ও সীমান্ত দিয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্র মিলিয়ে অপরাধীদের হাতে অস্ত্রের মজুদ বাড়ছে।

পিস্তল সহজলভ্য, আড়ালে অস্ত্র সিন্ডিকেট : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র তৈরির ভিডিও ও বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান ও দরদাম চলত। এসব চক্রের সদস্য এবং দেশীয় অস্ত্র তৈরির একাধিক কারখানায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে সাম্প্রতিক অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধের ঘটনাগুলোতে বিদেশি পিস্তল, বিশেষ করে ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার ও ৯ মিলিমিটার পিস্তলের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। সহজে বহন ও গোপন করা যায় বলে পরিকল্পিত হামলা, চাঁদাবাজি ও অপরাধী চক্রের সংঘর্ষে এসব অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বেশি। পাশাপাশি রিভলবার, শটগান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।

এসব ঘটনায় বিক্রেতা ও ডিলাররা গ্রেফতার হলেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে বড় জোগানদাতা ও মাফিয়ারা। প্রকাশ্যে আসছে না অস্ত্র সিন্ডিকেটের পুরো চিত্র। সচেতন মহলের অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার চেয়ারে থাকা অনেকের যোগসাজশ রয়েছে।

অস্ত্রের জোগান বাড়াচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও দখলসহ নানা অপরাধে অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। এসব অস্ত্রের জোগানের পেছনে অন্যতম কারণ হলো থানা থেকে লুট। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে, যার সত্যতাও আছে। এমনকি কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, অপরাধীরা যখন ইচ্ছামতো অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা ও দখলসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করতে পারে তখন সমাজে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থ হলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তখন অনেকেই নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অস্ত্র সংগ্রহ বা কাছে রাখতে চাইতে পারেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অপরাধীরাও অস্ত্রসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এ অবস্থায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা, অস্ত্র ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহিনীগুলোকে নতুন ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

সিনেমা-সিরিয়ালে অপরাধের পাঠ : স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, শুধু এখন নয়, দেশে সবসময়ই অবৈধ অস্ত্র ছিল। বেশ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বিদেশি অস্ত্র পাচার করে বেশ কিছু চক্র। সেই সঙ্গে থানা ও জেলখানা থেকে লুটের অস্ত্র যোগ হয়েছে। তবে আমরা অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে জিরো টলারেন্স। নানা অভিযানেই বিদেশিসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করছি। এ ছাড়া গত তিন মাসে সরকারি অস্ত্র উদ্ধার আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে এবং বিষয়টি ত্বরান্বিত হয়েছে।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, সিনেমা-সিরিয়ালে নানা সময় অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কৌশল দেখানো হয়। এসব দেখে বর্তমানে অনেক অপরাধী বাহিনীর অভিযানের ধরন বুঝে যায়। অনেকে সেসব চিত্র দেখে কীভাবে অপরাধ করা যায় এবং পার পাওয়া যায়, সেসব বিষয় রপ্ত করে। যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, পিস্তলের সহজলভ্যতা ও অপরাধের কৌশল রপ্ত করার প্রবণতা মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে তৈরি হয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। অস্ত্রের উৎস বন্ধ, বড় সিন্ডিকেট শনাক্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অপরাধের কৌশল প্রচারের বিষয়টিও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

সময়ের আলো/কেএইচও
  বিষয়:   মুড়িমুড়কি  ফুটছে গুলি  সময়ের আলো  অপরাধজগত  রাজনৈতিক প্রতিহিংসা  ক্ষমতা 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: