বীমা খাতের অনিয়ম ধরতে চার সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিজনেস

বীমা কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতি শনাক্ত করতে এবার যৌথভাবে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের চার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

2026-11-04T02:02:38+00:00
2026-11-04T02:02:38+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
বিজনেস
বীমা খাতের অনিয়ম ধরতে চার সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২:০২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বীমা কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতি শনাক্ত করতে এবার যৌথভাবে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের চার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর আওতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একযোগে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখবে।

প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ অর্থবছরের আর্থিক তথ্য, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দাবি পরিশোধ, কর ও ভ্যাট-সংক্রান্ত নথি এবং পুঁজিবাজারে লেনদেন পরীক্ষা করা হবে। ইতিমধ্যে এ জন্য চার সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ নিরীক্ষার কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) খসড়া করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা কোম্পানির আর্থিক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীন হওয়ায় আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে অনেক অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন। সমন্বিত নিরীক্ষা হলে একই তথ্য একাধিক সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে হিসাবের গরমিল, তথ্য গোপন, অর্থের অপব্যবহার ও সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্তের সুযোগ বাড়বে।

জানা গেছে, অন্তত এক ডজন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসংগতি ও অর্থের অপব্যবহারের ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বীমা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব কোম্পানি নিজেদের আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে আর্থিক তথ্যে অসংগতি থাকলেও তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।’

চার সংস্থার দায়িত্ব ভাগ : খসড়া টিওআর অনুযায়ী, এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাল্টি-রেগুলেটর কো-অর্ডিনেটেড স্পেশাল অডিট’। আইডিআরএর উদ্যোগে চার সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। আইডিআরএর পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য সংস্থাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে।

নিরীক্ষার কারিগরি কাজের জন্য একটি স্বাধীন ও যোগ্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কিংবা অনুমোদন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি হিসাবপত্র ও আর্থিক নথি যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে।

আইডিআরএ কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয়, পলিসিধারীদের তথ্য, দাবি নিষ্পত্তি, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ও লাইফ ফান্ডের অবস্থা পরীক্ষা করবে। পাশাপাশি বীমা বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ অনুযায়ী বিনিয়োগ হয়েছে কি না, আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া এফডিআরের ওপর লিয়েন সৃষ্টি করা হয়েছে কিনা এবং সলভেন্সি মার্জিন প্রবিধানমালা, ২০২৪ ও আইএফআরএস-১৭ অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে। গাড়ি কেনা, জ্বালানি ব্যয়, পুনঃবীমা ও পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীও নিরীক্ষার আওতায় থাকবে।

ব্যাংক হিসাব ও মূলধন যাচাই করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক : বাংলাদেশ ব্যাংক বীমা কোম্পানির ব্যাংক হিসাব, ঋণ, বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর, নগদ উত্তোলন এবং অস্বাভাবিক লেনদেন পরীক্ষা করবে। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের উৎস ও গন্তব্যও অনুসন্ধান করা হবে। বিশেষ করে পরিশোধিত মূলধন প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল কি না, নাকি সার্কুলার বা কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে মূলধন দেখানো হয়েছে, তা যাচাই করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন, রেমিট্যান্স ও পুনঃবীমার অর্থ দেশে এসেছে কি না, সেটিও দেখা হবে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং বিএফআইইউর নির্দেশনা পরিপালন ও অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকের পরিচয় যাচাই করা হবে।

কর ফাঁকি ও শেয়ার কারসাজিও নজরদারিতে : এনবিআর কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, হিসাবের খাতা ও আয়কর রিটার্নের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করবে। অঘোষিত আয়, গোপন লেনদেন, ভুয়া ব্যয়, উৎসে কর কর্তন এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত অনিয়মও খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে সংস্থাটি নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অন্যদিকে বিএসইসি কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করা তথ্য মিলিয়ে দেখবে। অনুমোদিত, ইস্যুকৃত ও পরিশোধিত মূলধন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ধারণ, শেয়ার বন্ধক, লক-ইন শর্ত এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিষয়গুলো যাচাই করা হবে। এ ছাড়া লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ার কারসাজির লক্ষণ পরীক্ষা করা হবে। আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়েছে কি না, তাও দেখা হবে।

পাঁচ বছরের তথ্য দিতে হবে কোম্পানিগুলোকে :
প্রাথমিকভাবে গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য নিরীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই সময়সীমা বাড়ানো বা কমানো যাবে। কোম্পানিগুলোকে হিসাবের খাতা, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, করসংক্রান্ত কাগজপত্র, বীমা দাবি নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী সরবরাহ করতে হবে। সরেজমিন তদন্তেও সহযোগিতা করতে হবে।

নিরীক্ষায় পাওয়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও বাণিজ্যিক নথির গোপনীয়তা রক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ এখতিয়ারে পাওয়া অনিয়ম, আর্থিক পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আইনি ধারার তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরবে। সব তথ্য সমন্বয় করে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

নিরীক্ষার কোনো বিষয়ে সংস্থাগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রথমে যৌথ সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। তাতে ঐকমত্য না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নিজস্ব মতামত ও যুক্তি তুলে ধরতে পারবে।

খসড়া টিওআরে বলা হয়েছে, প্রতিটি সংস্থা নিজস্ব আইনি এখতিয়ারের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করবে। ফলে যৌথ নিরীক্ষার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি সমন্বিত চিত্র পাওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   বীমা খাত  অনিয়ম  চার সংস্থা  সমন্বিত উদ্যোগ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিজনেস- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: