সংগৃহীত ছবিগত ছয় বছরে বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহে বড় উত্থান ঘটেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ডলারে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১ হাজার ৮১ কোটি ১৬ লাখ ডলার। তবে উল্লিখিত সময়ের সব অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকতা সমান ছিল না।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত মাসিক প্রবাসী আয় প্রবাহ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। এতে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ ডলারে নেমেছিল। পরের দুই অর্থবছরে তা বেড়ে ২০২২-২৩ সালে ২ হাজার ১৬১ কোটি ৭ লাখ এবং ২০২৩-২৪ সালে ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আসে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে এসেছে ৮৫৯ কোটি ২৩ লাখ ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭৫৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ২৮ শতাংশ।
তবে সেপ্টেম্বরে আগের মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে। ওই মাসে এসেছে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, আগস্টে এসেছিল ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। এক মাসে কমেছে প্রায় ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অবশ্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ শতাংশ।
সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স
দেশভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে— ৫০ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। এরপর যুক্তরাজ্য থেকে ৩৬ কোটি ১৮ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২৭ কোটি ২৩ লাখ, মালয়েশিয়া থেকে ২৩ কোটি ৬৭ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার এসেছে। ইতালি থেকে ১৮ কোটি ৬৬ লাখ, কুয়েত থেকে ১৪ কোটি ৯৪ লাখ, ওমান থেকে ১৩ কোটি ৬৪ লাখ, সিঙ্গাপুর থেকে ১৩ কোটি ১০ লাখ এবং কাতার থেকে ১২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার এসেছে।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে গরমিল
সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩ কোটি ৯২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৬ কোটি ২০ লাখ, অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ কোটি ৪৭ লাখ এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে ১৬ কোটি ২৯ লাখ ডলার এসেছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পেয়েছে ১৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।
আগস্টের তুলনায় অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৭.১৫ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৯৬.৯৫ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ৮৫ শতাংশের বেশি এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের রেমিট্যান্স কমেছে ২০.২৮ শতাংশ, ব্র্যাক ব্যাংকের ৩৫.৫৭ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে অসংগতি দেখা গেছে। পৃথক তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, সোনালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের রেমিট্যান্স যোগ করলে প্রায় ৫২ কোটি ২৮ লাখ ডলার হয়। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত রেমিট্যান্স দেখানো হয়েছে ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। একই ভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পৃথক হিসাব ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার হলেও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত অঙ্ক দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনের বর্ণনায় শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংকের নাম থাকলেও সেপ্টেম্বরে অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স ছিল বেশি। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসাবে ব্র্যাক ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে। এ সময়ে ইসলামী ব্যাংক ১০১ কোটি ২৫ লাখ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৮৭ কোটি ৯৪ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংক ৬৮ কোটি ৬০ লাখ এবং অগ্রণী ব্যাংক ৬৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে।
ঢাকায় এসেছে অর্ধেকের বেশি
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিভাগে এসেছে ১৪২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৫১.৬২ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে এসেছে ৭৪ কোটি ৮২ লাখ এবং সিলেটে ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুরে এসেছে যথাক্রমে ১১ কোটি ৯৮ লাখ, ৯ কোটি ৩৮ লাখ, ৫ কোটি ২৯ লাখ, ৪ কোটি ৯৮ লাখ ও ৩ কোটি ডলার। জেলাভিত্তিক হিসাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেটে এসেছে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স।
রেমিট্যান্সের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ব্যাংকভিত্তিক হিসাবের এসব অসংগতি ব্যাখ্যা করা জরুরি। এগুলো তথ্য সংকলন বা উপস্থাপনার ভুল হতে পারে, একে সরাসরি অনিয়মের প্রমাণ বলা যায় না। তবে নির্ভুল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অঙ্কগুলো যাচাই করে ব্যাখ্যা দেওয়া এবং প্রয়োজনে সংশোধিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/কেএইচও