ছবি : সংগৃহীত রাজধানী টোকিও শহরের ব্যস্ততম এলাকা শিন-কোবে। বাংলাদেশি প্রবাসীদের বেশ আনাগোনা এখানে। অনেকের কর্মক্ষেত্র, আড্ডা এই এলাকায়। ওকোবোয়ে মেট্রোস্টেশনের কয়েক মিটার দূরে প্রধান সড়ক লাগোয়া সুমন মিয়ার চা-সিঙ্গারা-সমুচার দোকান। বাঙালিদের বহুল পরিচিত ছোট্ট এই দোকানে ভিড় জমেই থাকে। কিন্তু এক সিঙ্গারা আর এক পেঁয়াজু খেতে খরচ করতে হয় ৪০০ ইয়েন, যা বাংলাদেশের ৩৫০ টাকার মতো। এ ছাড়া চা-কফি, সব্জির রোল খেতেও প্রায় একই রকম খরচ হয়। দৈনন্দিন জীবনে এত খরচ বহন করা মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। এর পেছনে ঘুরেফিরে সামনে আসছে এজেন্সির ভয়াবহ প্রতারণা।
দেড় যুগ ধরে ঢাকার সুমন মিয়ার ঠিকানা জাপানে। দীর্ঘদিন ধরে শিন-কোবে এলাকায় ফাস্টফুডের ব্যবসা করছেন তিনি। কয়েক স্কয়ার ফুট এই দোকানের ভাড়া তিন লাখ ইয়েন। এটি মূলত একটি মুদি দোকানের কিয়দাংশ। দোকানটি মূলত নাটোরের এক ব্যবসায়ীর ভাড়া নেওয়া।
জাপান সফরে বৃষ্টির এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, চা-সিঙ্গারা খেতে এসেছেন বাংলাদেশ ভারত নেপাল শ্রীলঙ্কার তরুণরা। বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। পেছনের গলিতে নোয়াখালীর এক ব্যক্তির ভাত-ভর্তার হোটেল। স্টুডেন্টরা সেখানেই রাতের খাবার খায়। দামের দৌড়ে পিছিয়ে নেই বাঙালি এই হোটেল। এক বাটি পাতলা ডাল নিতেই খরচা হয় ৪০০ ইয়েন।
রোজকার ব্যয়ের এই চিত্রই বলে জাপানে জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত উন্নত হলেও, ‘যেমন আয় তেমন ব্যয়’— এই প্রবাদটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়। অর্থাৎ জাপানে উপার্জন করার সুযোগ যেমন বেশি, ঠিক তেমনি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও বেশ চড়া।
এশিয়ার শ্রম রফতানির উন্মুক্ত বিশাল বাজার জাপানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৬০ হাজারের মতো বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছেন। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী।
কুমিল্লার তরুণ মোহাম্মাদ সাকিব হাসান। তিন বছর ধরে জাপানের রাজধানী টোকিওর ওহানাজায়াতে থাকেন। বর্তমানে টোকিওতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য প্রযুক্তি বিভাগে পড়াশোনা করছেন। সময়ের আলোর সঙ্গে তার দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়। সাকিব হাসানের মতে, কোনো সন্দেহ নেই জাপানে জীবনযাত্রার মান ফার্স্ট ক্লাস। কিন্তু টাকা না থাকলে জাপানের জীবন জাহান্নাম মনে হবে।
তিনি বলেন, স্টুডেন্টের পার্ট টাইম জবের পারমিশন সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা এবং ঘণ্টা প্রতি বেতন ১২৭০ ইয়েন। গ্রাম কিংবা মফস্বলে এই মজুরিটা আরও কম। এভাবে পার্টটাইম কাজ করে একজন স্টুডেন্ট সর্বোচ্চ বৈধভাবে ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়েনের মতো প্রতি মাসে ইনকাম করতে পারেন। এর মধ্যে টোকিওতে একজন স্টুডেন্টের মাসিক খরচ ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ইয়েনের মতো। বাকি টাকাটা তাকে টিউশন ফির জন্য সঞ্চয় করতে হয়। তাই বৈধভাবে পার্টটাইম জব করে বাড়িতে টাকা পাঠানো অসম্ভব প্রায়।
এই শিক্ষার্থী জানান, স্টুডেন্ট ভিসায় যারা আসে তারা মূলত ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে আসে। এরা মূলত অধিকাংশই এইচএসসি পাস করে আসে। তখন জীবন রঙিন লাগে তাই সাত-পাঁচ না ভেবেই চলে আসে। জাপানের ভাষার এন-৩ কোর্স শেষ করতে বাংলাদেশে সর্বসাকুল্যে খরচ হবে ৬০ হাজার টাকা, সময় লাগবে ৭ মাস। অথচ জাপানের ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে এগুলো শিখতেই খরচ হয় ১৬-১৭ লাখ টাকা। এ জন্য এটাকে আমি বলি, ‘ঞযব এৎবধঃ ঔধঢ়ধহবংব ঝপধস!’
এ সব অল্পবয়সি স্টুডেন্টের রক্তচুষে এজেন্সি আর জাপানের ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করে।
সাকিবের মতে, এইচএসসি পাস করা কারওরই উচিত নয় এরকম ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের ফাঁদে পা দেওয়া। এজেন্সি কখনোই সত্য বলবে না। এ জন্য সচেতনার বিকল্প নেই।
শিনঝিং মেট্রো স্টেশনে কথা হয় শিক্ষার্থী নিহালের সঙ্গে। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই শিক্ষার্থী সম্প্রতি ধারদেনা করে জাপানে এসেছেন। নিত্যদিনের খরচ মিটিয়ে এখনও বাড়িতে তেমন টাকাই পাঠাতে পারছেন না। একটি রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন কাজ করে যা আয় করেন তা পড়াশোনার খরচে চলে যায়।
প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাপানে শহরভেদে মাসিক বাসা ভাড়া (শেয়ারিং বা ছোট ফ্ল্যাট) ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ইয়েন বা তার বেশি। এক রুমে অনেক সময় ৫ জন স্টুডেন্টও থাকেন।
ইউটিলিটি বিল (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট) প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ইয়েন। জাপানে ট্রেন বা বাসের ভাড়া বেশ চড়া। কিলোমিটার প্রতি হাজারখানেক ইয়েন ভাড়া আসে উবারে।
এ ছাড়া জাপানে আয়ের একটা বড় অংশ সরকারি নিয়মে কেটে নেওয়া হয়। বেতনের টাকা থেকে সামাজিক বীমা (হেলথ ইনস্যুরেন্স ও ওয়েলফেয়ার পেনশন) এবং আয়কর কেটে রাখা হয়। দ্বিতীয় বছর থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় রেসিডেন্স ট্যাক্স (আগের বছরের আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ)। নিজে রান্না করে খেলে মাসে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ইয়েনের মধ্যে সম্ভব। তবে নিয়মিত বাইরে রেস্তোরাঁয় খেলে এই খরচ দ্বিগুণ বা তিনগুণ হতে পারে।
জাপান সরকারের শিক্ষার্থী সহায়তা সংস্থা জাসসোর হিসাবে দেখা যায়, প্রতি বছর এই দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বাড়ছে। জাপানে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ার আড়ালে রয়েছে খরচ ও ঋণ। ভাষাগত দক্ষতা ও চাকরির অনিশ্চয়তার মতো প্রশ্নও সামনে আসছে। বিশেষ করে এজেন্সির আয়ের প্রতিশ্রুতি শুনে ঋণ নিয়ে যারা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাদের জন্য ঝুঁকির হিসাবটা আরও জরুরি মনে করছেন এখানকার শিক্ষার্থী।
জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা সময়ের আলোকে জানান, বর্তমান জাপান সরকার ভিসাসহ কর্মক্ষেত্রে বেশকিছু নিয়ম আরও কড়াকড়ি করেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ঘোষিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি তিন মাসে শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে তিনি কোথায় কাজ করছেন এবং প্রতিদিন কত ঘণ্টা কাজ করছেন। কোনো নিয়োগকর্তা একজন শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে সে তথ্যও ইমিগ্রেশনকে জানাতে হবে। এসব নিয়মে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কাউন্সিলর বলেন, এক বিষয়ে ডিপ্লোমা করে এসে অন্য সেক্টরে চাকরি করলে বিপদে পড়তে হবে। এ ছাড়া চুক্তির সঙ্গে যখন কর্মক্ষেত্রের মিল থাকে না, তখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে দেয় জাপান। যেমন কোনো ছাত্র ডিপ্লোমা করছেন মেকানিক্যাল বিষয়ে, তিনি যদি কৃষিতে জব নেন, তা হলে তার ভিসা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। জাপানে সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার বেশি খণ্ডকালীন চাকরি করলে স্টুডেন্টদের দুই সপ্তাহের ভিসা দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেবে।
তিনি বলেন, স্টুডেন্টদের সঙ্গে বিভিন্ন এজেন্সি প্রতারণা করছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে এজেন্সি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীর টিউশন ফিসসহ জাপানে আসতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। কিন্তু এজেন্সি নয়-ছয় বলে কয়েক লাখ টাকা বেশি নিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা লোভ দেখিয়ে স্টুডেন্টদের আকৃষ্ট করছে। এদের বিরুদ্ধে আমরা বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা জাপানে স্টুডেন্ট পাঠানোর চ্যানেলগুলো পরিচ্ছন্ন করতে চাই।
তিনি বলেন, জাপানে পড়ার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকলেও এর নির্দিষ্ট আইনি সীমা রয়েছে। ছাত্র ভিসায় কাজ করতে হলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আলাদা অনুমতি নিতে হয়। সাধারণ সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা কাজ করা যায়। এখানেই এজেন্সির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য। শিক্ষার্থীদের ঘণ্টায় ৩ হাজার ইয়েন আয় কিংবা মাসে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ইয়েন আয়ের যে প্রতিশ্রুতি কিছু দালাল বা এজেন্সি দিয়ে থাকে, তা মিথ্যা। তাই সম্ভাব্য আয়কে নিশ্চিত ধরে বিদেশে আর্থিক পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এই কর্মকর্তা বলেন, মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয়ের এজেন্সির প্রতিশ্রুতি স্টুডেন্ট ও তার পরিবারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে ঋণ নিয়ে জাপানে এলে শিক্ষার্থীকে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। ঋণ শোধের চাপে তাকে বেশি সময় কাজ করতে হতে পারে। বেশি কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি কমে যেতে পারে। উপস্থিতি কমে গেলে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে সমস্যা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জাপান ছাড়তে হলেও ঋণের দায় থেকে যায়। বুদ্ধিমানের কাজ বাংলাদেশে জাপানে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে যেসব প্রচার চলছে, সেগুলোর সবকিছু যাচাই করে দেখা।
আট বছর ধরে জাপানের বিখ্যাত হিরোশিমা অঞ্চলে সপরিবারে থাকেন ডা. জিয়াউর রহমান। জনস্বাস্থ্যের ওপর গবেষণা করছেন হিরোশিমা ইউনিভার্সিটিতে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, জাপানে নতুন সরকার আসার পর পড়াশোনার সঙ্গে ভিসার ক্যাটাগরি না থাকলে খুব ঝামেলা করছে। আর জাপানিজ কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে না। জাপানে প্রতারণা করলে ওই কোম্পানি ভ্যানিশ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের এজেন্সিগুলো প্রলোভন দেখিয়ে স্টুডেন্টদের কাছ থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সময়ের আলো/এসএকে