শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার নেপথ্যে

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

এমনিতেই দেশের শিল্প খাতে বহুমুখী সংকট চলে আসছে বিগত দুই সরকারের আমল থেকেই। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতাসহ

2026-11-02T01:14:18+00:00
2026-11-02T01:14:18+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
চরম উদ্বিগ্ন শিল্প মালিকরা
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার নেপথ্যে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১:১৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
এমনিতেই দেশের শিল্প খাতে বহুমুখী সংকট চলে আসছে বিগত দুই সরকারের আমল থেকেই। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতাসহ আরও কিছু চাপ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার মধ্যেও শিল্পে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছিলেন কারখানার মালিকরা। 

গত এক-দেড় বছর শিল্পে বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের পরিস্থিতি বেশ শান্তই ছিল। হঠাৎ করেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে সরকার যখন আগে-ভাগেই মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তখন আন্দোলনের নামে রাজপথে নেমে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, কারখানায় হামলা-লুটপাট চালাচ্ছে শ্রমিক নামধারী একটি গোষ্ঠী। শিল্প মালিক, শ্রমিক নেতারাও বলছেন— এই আন্দোলনে তৃতীয় কোনো পক্ষ ঢুকে সহিংসতা চালাচ্ছে, শিল্পে ধ্বংসযজ্ঞ করছে।

এদিকে গত কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলনের নামে শিল্পে অস্থিরতায় শিল্প মালিকরা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার বিজিএমইএ ভবনে ৫ শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা মালিক বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা শিল্পের নিরাপত্তা চেয়েছেন। একই সঙ্গে অহেতুক আন্দোলনের নামে কারখানায় ভাঙচুর অব্যাহত থাকলে শ্রম আইনের ১৩-এর ১ ধারা অনুযায়ী সব গার্মেন্টস কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন বলে জানান তারা।

অন্যদিকে শ্রমিক নেতারাও বলছেন, শুরুতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নামলেও এখন সে আন্দোলন ছিনতাই হয়ে গেছে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় আন্দোলনের নামে রোববার যে অরাজকতা চলেছে, তা শ্রমিকরা করেননি। এই সহিংসতা চালিয়েছে মিরপুর এলাকার উচ্ছেদ করা হকার, হকারদের কাছ থেকে যারা চাঁদা তুলত তারা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

এমন তথ্য জানিয়ে মিরপুর এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘এখন যে আন্দোলনটা হচ্ছে সেটি শ্রমিক আন্দোলন না, অন্য পক্ষ এখানে নেমেছে। এখানে যেমন রাজনৈতিক ইন্ধন আছে, তেমনি মিরপুর এলাকার হকারও আছে। শ্রমিক আন্দোলনটা ছিনতাই করে নিয়েছে তৃতীয় কোনো অপশক্তি। কোনো রাজনৈতিক শক্তি, হকার এবং চাঁদাবাজ, হকার উচ্ছেদ করার কারণে যাদের চাঁদা তোলা বন্ধ হয়ে গেছে তারাও এগুলোতে ইন্ধন দিচ্ছে। 

আমরা বলব, সরকারকে এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে হবে। ইতিমধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। কোনো আপত্তি থাকলে যথাযথভাবে যেন আমরা আমাদের কথা জানাই। তাই আমরা বলব, শ্রমিকরা যেন নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যায় এবং বোর্ডকে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য সুযোগ করে দেয়।’

এদিকে শিল্প মালিকরা বলছেন, ‘শিল্পে নানা রকম সংকট থাকার পরও নতুন মজুরি নিয়ে মালিকদের কোনো আপত্তি ছিল না। সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালিকরা মজুরি বোর্ডে প্রতিনিধির নাম পাঠিয়েছেন, যাতে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা যায়। তারপরও কেন এই আন্দোলন।’

একই প্রশ্ন ছুড়ে বিজিএমইএর পরিচালক ও নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বেশ আগেই নতুন মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে আমার নাম চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়েছে। 


অথচ শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধির নাম চাওয়া হলেও এতদিন দেওয়া হয়নি। মাত্র আজ রোববার (গতকাল) তারা তাদের প্রতিনিধির নাম দিয়েছে। তা হলে আন্তরিকতার অভাব কাদের আছে, মালিক না শ্রমিকদের? এই প্রশ্ন আমার। আমরা আগেভাগেই উদ্যোগ নেওয়ার পরও কেন শিল্পে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। আন্দোলনের নামে এই অরাজকতা আমরা সহ্য করব না। এ জন্য আমরা গার্মেন্টস মালিকরা আজ রোববার বৈঠকে বসেছিলাম। আমরা আর একটি দিন দেখব।সোমবার (আজ) যদি আবার কারখানায় হামলা হয়, ভাঙচুর হয়, তা হলে আমরা সব গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করে দেব।’

নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা : এদিকে পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল রোববার সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। ছয় সদস্যের বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন।

শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনের মধ্যেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী বলেন, আজই (গতকাল) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হবে। গত শনিবার মালিক, শ্রমিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন তিনি।

মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে শ্রমমন্ত্রী বলেন, আমরা শ্রমিক সংগঠনগুলোর, বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ চার ঘণ্টা আলোচনা করেছি। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষণা দিয়েছি, রোববার আমরা মজুরি বোর্ড গঠন করব।

নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত বিকেএমইএর : পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এক বার্তায় জানিয়েছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের পাশাপাশি কারখানার কার্যক্রম সচল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পোশাক শ্রমিকরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা বিকেএমইএ উপলব্ধি করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং কারখানাগুলোতে রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও বাস্তব।

বার্তায় বলা হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা এবং কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা— দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন মজুরি বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিক— তিন পক্ষেরই প্রতিনিধি রয়েছেন। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করে বিকেএমইএ। তিনি বলেন, এমন একটি মজুরি কাঠামো হওয়া প্রয়োজন, যা শ্রমিকদের জীবনমান সুরক্ষিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতাও বজায় রাখবে।

বার্তায় আরও বলা হয়, শ্রমিক ও শিল্প একে অন্যের পরিপূরক। উভয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত হলেই দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। বিকেএমইএর বার্তায় বলা হয়, ‘শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে।’

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   শিল্পাঞ্চল  অস্থিরতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: