এলডিসি উত্তরণে মোকাবিলা করতে হবে ৩ চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি

2026-11-02T02:38:38+00:00
2026-11-02T02:38:38+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
এলডিসি উত্তরণে মোকাবিলা করতে হবে ৩ চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ২:৩৮ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যে তিন চ্যালেঞ্জের কথা তিনি বলেছেন তা হলো— প্রথমত এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তৃতীয়ত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা।

রোববার রাজধানীতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

দেবপ্রিয় বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার কমানো, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো একই সময়ে করতে হবে। আবার বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করাও জরুরি। 

তার মতে, এই তিনটি লক্ষ্য পরস্পরের পরিপূরক। সরকার যদি সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা অর্থনীতি ও দেশ উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তিনি আরও বলেন, আগামী তিন বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক চক্রের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় শেষে দেশ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। 

ফলে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই তিনটি লক্ষ্য সময়বদ্ধ, সমন্বিত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করাই সরকারের বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দায় এলডিসি উত্তরণে সংস্কার : সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবকে চিঠি লিখে সহযোগিতা চেয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। 

তবে এই বাড়তি সময়কে কেবল সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রধানমন্ত্রী নিজে উদ্যোগ নিয়ে সময় বাড়ানোর আবেদন করায় এখন সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক দায় তার নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর বর্তেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার না হলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং পণ্য ও সেবা পরিবহন বা লজিস্টিকস— এই চার খাতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, বাড়তি তিন বছরকে কাজে লাগাতে হলে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা, দায়িত্ব বণ্টন এবং অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সংস্কারকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত করে সংসদ ও মন্ত্রিসভার জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে চিঠি দিয়ে সময় বাড়ানোর আবেদন করায় বিষয়টি এখন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হয়ে গেছে। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংস্কার করতে হবে। তা না হলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, ‘যদি সংস্কার আপনি না করেন, তা হলে কিন্তু আপনার কথার বরখেলাপ হবে। তা হলে কিন্তু দেশ হিসেবে আমাদের যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সেটিতে আঘাত আসবে— এটি স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি ব্যতিক্রমী। তাই এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। শুধু উত্তরণের সময় পেছানো নয়, এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা তৈরি করাই হবে সরকারের প্রধান কাজ।

চার খাতে সংস্কার জরুরি : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, প্রথমেই সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে হবে। এর মধ্যে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করব্যবস্থার সক্ষমতা উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য এটিকে ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত জ্বালানি। শিল্প ও উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি সংকট বিনিয়োগ ও উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করলে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।

তৃতীয় খাত সামাজিক সুরক্ষা। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যেসব শ্রমিক ও জনগোষ্ঠী ঝুঁকিতে পড়বে, তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রফতানি খাতের পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থ খাত লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা। বন্দরের সক্ষমতা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, পণ্য খালাস, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহের সময় কমাতে হবে। ব্যবসার খরচ কমানো ও রফতানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এ খাতের সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, ব্যবস্থাপনা ও সেবার মানোন্নয়নেও জোর দিতে হবে।

অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানোর চ্যালেঞ্জ : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশকে একই সময়ে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রথমত এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া। দ্বিতীয়ত সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটির অগ্রগতি ছাড়া অন্যগুলো টেকসই হবে না।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ও সুদহারের স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করার মতো বিষয়গুলোতে সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ খেলাপি ছিল। এ অবস্থায় আর্থিক খাতে সুশাসন ও ঋণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

সংসদে জবাবদিহি ও অগ্রগতি প্রকাশের প্রস্তাব : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নকে শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজ হিসেবে রাখলে চলবে না। এটিকে রাজনৈতিক ও জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। সংসদে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা, মন্ত্রিসভার নিয়মিত পর্যালোচনা এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোন মন্ত্রণালয় কী দায়িত্ব পালন করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী ফল দেবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। সিপিডির পক্ষ থেকে ২৩টি সংস্কার প্রস্তাবের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের উদ্যোগের তথ্যও তুলে ধরা হয়।

সংস্কারের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে একটি ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব দেন দেবপ্রিয়। এতে প্রতিটি খাতের লক্ষ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখা যাবে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করে ১০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় ককাস গঠনের উদ্যোগের কথাও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে স্পিকারের দফতর থেকে নোটিস জারির প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাড়তি তিন বছর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সময় বাড়লেই অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়বে না। রাজস্ব, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা, লজিস্টিকস, ব্যাংকিং ও রফতানি বহুমুখীকরণে দৃশ্যমান সংস্কার করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনাই নির্ধারণ করবে— বাংলাদেশ এই সময়কে কতটা কাজে লাগাতে পারবে।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   এলডিসি  চ্যালেঞ্জ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: