গ্রাফিক সময়ের আলোসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে দেশে নারী উদ্যোক্তাদের অনলাইন ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। ঘরে বসে তৈরি পোশাক, গহনা, খাবার, হস্তশিল্প, প্রসাধনী কিংবা নানা ধরনের পণ্য বিক্রি করে অনেক নারী স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফেসবুক পেজ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্ডার নেওয়া থেকে শুরু করে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্য তৈরি ও প্যাকেজিং, সবকিছুই সামলাতে হয় তাদের। তবে ব্যবসার এই পথচলায় বড় একটি চ্যালেঞ্জ পণ্য ডেলিভারি। বিশেষ করে পার্সেল সময়মতো না পৌঁছানো, পণ্য হারিয়ে যাওয়া, ক্রেতার ফোন না ধরা কিংবা অর্ডার করার পর পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর মতো ঘটনায় আর্থিক ও মানসিক দুই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন নারী উদ্যোক্তারা।
ডেলিভারি ব্যবস্থাপনায় বিড়ম্বনা
অনলাইন ব্যবসায় ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই কুরিয়ার বা পার্সেল সার্ভিসের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছায় না। কখনো পার্সেল ভুল ঠিকানায় চলে যায়, আবার কখনো ডেলিভারি কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যায় ক্রেতা পণ্য হাতে পান না। এর ফলে ক্রেতার অসন্তোষের মুখে পড়তে হয় উদ্যোক্তাকে।
কিড্ডিসের স্বত্বাধিকারী আরিফা আক্তার পিয়া বলেন, ‘আমরা অনেক যত্ন নিয়ে পণ্য তৈরি ও প্যাকেজিং করি। কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিসের কারণে পণ্য দেরিতে পৌঁছালে ক্রেতা আমাদের ওপরই বিরক্ত হন। অনেক সময় ক্রেতা মনে করেন, আমরা ইচ্ছা করেই পণ্য পাঠাতে দেরি করছি। অথচ পার্সেল পাঠানোর পর সেটি কখন পৌঁছাবে, তা সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’
সমস্যা হলো, ক্রেতা সাধারণত পণ্য যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনেছেন, সেই বিক্রেতাকেই দায়ী করেন। কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের ভুল বা অব্যবস্থাপনার কারণে পণ্য দেরিতে পৌঁছালেও অভিযোগের মুখে পড়তে হয় নারী উদ্যোক্তাদের। এতে ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়।
অর্ডার করেও পণ্য নেন না ক্রেতা
ডেলিভারি নিয়ে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অর্ডার নিশ্চিত করার পর অনেক ক্রেতা ফোন ধরেন না। কেউ কেউ ডেলিভারি কর্মীর ফোন পেয়ে জানান, তারা আর পণ্যটি নিতে চান না। আবার কেউ কোনো কারণ না জানিয়েই পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।
এ প্রসঙ্গে কুমুদিনীর বসনের স্বত্বাধিকার জেরিন রওনক বলেন, ‘অনেক ক্রেতা পণ্য অর্ডার করার সময় খুব আগ্রহ দেখান। আমরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুত করে পাঠাই। কিন্তু ডেলিভারির সময় ফোন করলে তারা ফোন ধরেন না। কখনো আবার বলেন, পণ্যটি আর প্রয়োজন নেই। এতে শুধু ডেলিভারি চার্জ নয়, পণ্য ফেরত আনার খরচও আমাদের বহন করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কাস্টমাইজড পণ্যের ক্ষেত্রে।’
বিশেষ করে খাবার, কাস্টমাইজড পোশাক, কেক কিংবা অর্ডার অনুযায়ী তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। কারণ এসব পণ্য অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না।
ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনাকারী নারীদের জন্য এ ধরনের ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন। অনেকেই নিজের সঞ্চয়, পরিবারের সহযোগিতা কিংবা অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ফলে কয়েকটি অর্ডার ফেরত এলেও তাদের লাভের বড় অংশ চলে যায়।
বিশ্বাস ও যোগাযোগের সংকট
অনলাইন কেনাকাটায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই পুরো লেনদেন নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। পণ্যের ছবি দেখে অর্ডার করার পর ক্রেতার প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের কিছুটা পার্থক্য থাকলে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
আর্ট্রিস্ট্রির স্বত্বাধিকার তাসলিমা বলেন, ‘অনলাইন ব্যবসায় ক্রেতা ও বিক্রেতা দুপক্ষেরই দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কোনো পণ্য পছন্দ না হলে অর্ডার বাতিল করা যেতে পারে, কিন্তু পণ্য পাঠানোর পর ফোন না ধরা বা না নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অনেক দিনের পরিশ্রম নষ্ট হয়।’
সমাধানে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ
ডেলিভারি-সংক্রান্ত সমস্যা কমাতে নারী উদ্যোক্তাদের কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অর্ডার নেওয়ার সময় ক্রেতার নাম, ঠিকানা ও সচল ফোন নম্বর নিশ্চিত করা জরুরি। পণ্য পাঠানোর আগে ফোন বা মেসেজের মাধ্যমে অর্ডারটি আবার নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিশেষ করে কাস্টমাইজড বা বেশি দামের পণ্যের ক্ষেত্রে অগ্রিম কিছু টাকা নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হবে। পার্সেল বুকিংয়ের পর ট্র্যাকিং নম্বর সংগ্রহ করে ক্রেতাকে জানাতে হবে। পণ্য পাঠানোর আগে ভালোভাবে প্যাকেজিং করা এবং পণ্যের ছবি বা ভিডিও সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেলিভারি সমস্যাকে শুধু উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, ক্রেতার দায়িত্বশীল আচরণ এবং বিক্রেতার স্বচ্ছতা, এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ একজন নারী উদ্যোক্তার কাছে প্রতিটি অর্ডার শুধু একটি পণ্য বিক্রি নয়, বরং তার শ্রম, সময়, পুঁজি ও স্বপ্নের প্রতিফলন। সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে অনলাইন ব্যবসার পুরো সরবরাহব্যবস্থায় আস্থা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা