গ্রাফিক : সময়ের আলোতৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কার্যকর করা হবে আগামী মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে। চলতি নভেম্বরের মধ্যেই মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে, আর নতুন মজুরি কাঠামোর বেতন শ্রমিকরা হাতে পাবেন আগামী জানুয়ারির শুরুতে। গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান নিম্নতম মজুরি বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে বলেও জানান তারা।
বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তারা। বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানীর সভাপতিত্বে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে সভা শুরু হয়।
এদিকে এখনও পর্যন্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য মজুরি বাড়ানো হয়েছে মোট ৬ বার। এবার মজুরি বোর্ড গঠনের পর যত দ্রুত সময়ের মধ্যে বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, অতীতে এত দ্রুত কখনো হয়নি। মজুরি বোর্ড গঠনের পর কোনো বার ৪ মাস পর আবার কখনো ৬ মাস পার হওয়ার পর মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারই মজুরি বোর্ড গঠনের মাত্র ২ দিন পরই মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে দেরি করে, তবুও দ্রুত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা।
এবারের শ্রমিক আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও কারখানার মালামাল লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের এই মারমুখী অবস্থার মধ্যেও শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বেশ ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভা শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আজ যা হয়েছে কোথাও যদি হয়ে থাকে, এটাকে আন্দোলন নাকি রাজনৈতিক এজেন্ডা, নাকি সহিংসতা, এটা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।’ তিনি বলেন, শ্রমিকপক্ষ নাম দেওয়ার পরদিনই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বুধবার বোর্ডের প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান সবার বক্তব্য শুনবেন। অতীতে পাঁচ বছর পরপর মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে হারে বৃদ্ধি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করে যৌক্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে।’ মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক : গত ১ নভেম্বর তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে ৬ সদস্যের ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ গঠন করে সরকার।
গতকাল বুধবার বোর্ডের চেয়ারম্যান জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানীর সভাপতিত্বে বোর্ডের প্রথম সভা হয়। সভায় বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বৈঠক শেষে বলেন, ‘আজকের সভায় আমরা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব ও আলোচনা করেছি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিও একমত হয়েছেন, নতুন মজুরি ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে কার্যকর হবে। জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতন দেওয়ার সময় শ্রমিকরা নতুন মজুরি অনুযায়ী বর্ধিত বেতন পাবেন। এ বিষয়ে দুপক্ষের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।
শ্রমিকদের মজুরির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিভিন্ন অঙ্কের মজুরির প্রস্তাব দিয়েছে। কেউ ৩০ হাজার টাকা, কেউ ২৭ হাজার টাকা, আবার কেউ ডলারের হিসাবে মজুরি দাবি করেছে। তবে সব শ্রমিক ফেডারেশন একসঙ্গে বসে একটি সমন্বিত দাবি তৈরি করে পরবর্তী সভায় বোর্ডের কাছে উপস্থাপনের চেষ্টা করবে।
বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্যের কাছেও শ্রমিকদের জন্য একটি যৌক্তিক মজুরির প্রস্তাব দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান বাবুল আখতার। তিনি বলেন, মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ সদস্যের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বোর্ড সুপারিশ তৈরি করবে। পরে তা শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সরকার সেই সুপারিশ বিবেচনা করে গেজেট প্রকাশ করবে।
সভা শেষে বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী সাংবাদিকদের বলেন, মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষ মজুরি-প্রস্তাব পৃথকভাবে জমা দেবে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ সদস্যও একটি মজুরি-প্রস্তাব দেবেন। তারপর সেই মজুরি-প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মজুরি চূড়ান্ত করে ঘোষণা দেওয়া হবে।
গত রোববার শ্রম মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে। বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এবং মালিক ও শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যথাক্রমে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে নিয়োগ করা হয়।
গতকাল বুধবার সকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদে বদলি করা হয়। একই আদেশে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানীকে। তবে আশফাকুর রহমানকে সরানোর কোনো কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি।
একাধিক সূত্র জানায়, পোশাকশিল্পের মতো স্পর্শকাতর খাতের মজুরি নির্ধারণে সদ্য বিদায়ি চেয়ারম্যানের ওপর ভরসা করা যাচ্ছিল না। সে জন্য গত দু-তিন দিনে তাকে বদলির প্রক্রিয়া চলে।
আন্দোলনে সহিংসতা না করার আহ্বান : এদিকে প্রথম বৈঠক শেষে চলমান শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতার বিষয়ে বাবুল আখতার বলেন, আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ বা রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আলোচনা হচ্ছে। তিনি শ্রমিকদের এ ধরনের কোনো ইন্ধনের শিকার না হওয়ার আহ্বান জানান।
সভা শেষে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেছে। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই মজুরি বোর্ড কাজ করছে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার বিষয়ে তারা আশাবাদী।
এবার দাবি ৩০ হাজার টাকা : তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন মজুরি কাঠামোতে সেটি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। একবারে ১৪০ শতাংশ মজুরি বাড়ানো হলে কারখানার উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম। এতে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরিতে একজন শ্রমিকের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়। বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি যৌক্তিক।
এশিয়ার প্রধান পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার তালিকাভুক্ত শীর্ষ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১০১ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের সর্বোচ্চ ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১ হাজার ৫১২ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪২ টাকা। ডলারপ্রতি ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা হিসাবে এই রূপান্তর করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ চীনে প্রদেশভেদে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ২৫০ থেকে ৩৫৩ ডলার; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩১ হাজার ৭৫ থেকে ৪৩ হাজার ৮৭৮ টাকা। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী কম্বোডিয়ায় এই মজুরি ২০৮ ডলার বা প্রায় ২৫ হাজার ৮৫৪ টাকা। প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১৪৩ থেকে ৪৯৬ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৫ থেকে ৬১ হাজার ৬৫৩ টাকা। ভিয়েতনামে তা ১৩৬ থেকে ১৯৫ ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার ৯০৫ থেকে ২৪ হাজার ২৩৯ টাকা।
এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১৮৩ ডলার বা প্রায় ২২ হাজার ৭৪৭ টাকা। পাকিস্তানে এই মজুরি ১২৩ থেকে ২১১ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার ২৮৯ থেকে ২৬ হাজার ২২৭ টাকা।
মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস : বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রথম ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয় ১৯৮৫ সালে। তখন সর্বনিম্ন গ্রেডের শ্রমিকের মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২৭ টাকা। এরপর ১৯৯৪ সালে তা বেড়ে হয় ৯৩০ টাকা। ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ টাকা, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ প্রায় চার দশকে কাগজে-কলমে সর্বনিম্ন মজুরি বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে