বেলা সাড়ে ৩টায় এই ম্যাচ দিয়েই পর্দা উঠবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের। ছবি : সংগৃহীতসংস্কার শেষে নতুনরূপে ফিরেছে জাতীয় স্টেডিয়াম। গ্যালারি থেকে প্রেসবক্স, ভিআইপি বক্স— সবখানে নতুন সাজ। দেয়ালগুলোর পুরোনো আস্তর উঠে তাতে নতুন প্রলেপ পড়েছে। রংতুলির আঁচড় লেগেছে গ্যালারির প্রতিটি কোনায়।
ঘাস পরিবর্তন থেকে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা— কোথাও বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই। ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় টুর্নামেন্ট। ৬ দলের অংশগ্রহণে এই আয়োজন উপলক্ষে একটি ভেন্যু যেভাবে তৈরির প্রয়োজন, ঠিক সেভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছে। দল হিসেবে স্বাগতিক বাংলাদেশও নিজেদের সব প্রস্তুতি সেরেছে; এখন লড়াইয়ে নামার অপেক্ষায়। আজ ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সাফ মিশন শুরু করবে টমাস ডুলির দল। রাত ৮টায় শুরু হবে ম্যাচটি। একই দিন একই ভেন্যুতে চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানও খেলবে। বেলা সাড়ে ৩টায় এই ম্যাচ দিয়েই পর্দা উঠবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের।
চতুর্থবারের মতো ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলযজ্ঞ সাফ। শুরুটা ২০০৩ সালে। এরপর ২০০৯ ও ২০১৮ সালের পর আবারও আয়োজক বাংলাদেশ। আয়োজনে মুন্সিয়ানা কিংবা আয়োজক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও ট্রফি জয়ের সংখ্যা কিন্তু নগণ্য। মাত্র একবার সাফ ট্রফি ঘরে তুলেছে লাল-সবুজরা। সেই ২০০৩ সালে। এরপর ২৩ বছর কেটে গেলেও ট্রফি জেতার আক্ষেপ ঘুচেনি। এবার লক্ষ্য পরিষ্কার। ঘরের মাঠে ট্রফি জিততে হবে। হাসি ফোটাতে হবে কোটি ফুটবল সমর্থকের মুখে। গতকাল রাজধানীর এক হোটেলে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান বাংলাদেশের কোচ টমাস ডুলি এবং অধিনায়ক তপু বর্মণ।
সাফ দিয়ে প্রথমবার দেশের মাটিতে ডাগআউটে দেখা যাবে কোচ ডুলিকে। সবশেষ ফিফা আসিয়ান কাপে দলের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখতে না পারলেও, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। ডুলি জানান, ‘আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে যে আমরা খেলতে পারব, লড়াই করতে পারব এবং লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। এই টুর্নামেন্টে আমাদের জেতার বাস্তবসম্মত সুযোগ আছে। ২৩ বছর পর এটা সম্ভব। তবে এর জন্য কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলা এবং শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করতে হবে।’ যদিও এই জার্নি সহজ নয়, তারপরও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের কোচ, ‘আমরা জিততে এসেছি। প্রতিটি দলের বিপক্ষেই আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা এই টুর্নামেন্ট জিততে চাই।’
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের বয়স ৩৩ বছর। ১৪তম আসর পেরিয়ে এখন ১৫তম শুরুর অপেক্ষায়। এর মধ্যে মাত্র একবার ট্রফি জেতার স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ১৯৯৯ ও ২০০৫ সালে ফাইনালে উঠলেও রানার্সআপে সন্তুষ্ট থাকে দল। এর বাইরে টুর্নামেন্টে কয়েকবার সেমিফাইনালেও খেলেছে লাল-সবুজরা। ৬ দলের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ এবার ‘এ’ গ্রুপে পড়েছে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। ‘বি’ গ্রুপে আসরের সর্বাধিক চ্যাম্পিয়ন ভারতের সঙ্গে রয়েছে মালদ্বীপ এবং পাকিস্তান। ভুটান ম্যাচ দিয়ে আজ আসর শুরু করা বাংলাদেশের গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে ১১ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। গ্রুপে সর্বাধিক পয়েন্টধারী দুদল খেলবে সেমিফাইনালে। টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৭ নভেম্বর।
বাংলাদেশের পরিচিত এবং পুরোনো প্রতিপক্ষ ভুটান। সেই ১৯৮৪ সালে সাফ গেমস দিয়ে দুদলের লড়াইয়ের যাত্রা। এরপর সাফ গেমস ছাড়াও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। দুদলের লড়াইয়ে বরাবরই ফেবারিট বাংলাদেশ। ১৭ বারের দেখায় বাংলাদেশের জয় ১৩; ভুটানের জয় কেবল ২টি। এ ছাড়া ২টি ম্যাচে ড্রয়ে মাঠ ছাড়া তারা। সাফে সবশেষ মুখোমুখি হয় ২০২৩ সালে। সেবারও জয়ের হাসি ছিল বাংলাদেশের। তবে একবার ম্যাচ জয়ের হাসি ভুটানও হেসেছিল; সেটি ২০১৫ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। সেই হারের পর ভুটানকে সমীহ করলেও খেলার মাঠে বরাবরই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। আজও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে মন্তব্য করেন টমাস ডুলি।
গত বছর লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক হয় তারকা ফুটবলার হামজা চৌধুরীর। শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু করলেও ঘরের মাঠে হামজার প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল ভুটান। অভিষেক ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে গোলেও নাম লেখান হামজা। তবে বাংলাদেশের এত বড় তারকাকে ছাড়াই আজ ভুটানের বিপক্ষে খেলতে হচ্ছে। কারণ ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ত সূচির কারণে এই ম্যাচে খেলতে পারছেন না তিনি। তবে সাফের পরের ম্যাচগুলোয় হামজা থাকছেন বলে বাফুফে জানিয়েছে। একই সঙ্গে হামজার অনুপস্থিতি ভুটান ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ম্যাচে প্রভাব না ফেললেও ভুটানের বিপক্ষে হামজাকে মিস করবেন বলে জানিয়েছেন জামাল ভূঁইয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের নতুন অধিনায়ক তপু বর্মণ, হামজাকে অনেক মিস করব। তার মতো নেতৃত্ব আমাদের দলে খুবই প্রয়োজন। সে যেভাবে আমাদের গাইড করে, সেটা বিশেষ কিছু। তবে আমরা আগে থেকেই জানি, সূচির কারণে প্রথম ম্যাচে তাকে পাব না। আমাদের কাজ হবে পথটা তার জন্য সহজ করে দেওয়া, অর্থাৎ ভুটানের বিপক্ষে জেতা। সে যেন জয়ী দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারে, আমরা সেটাই চাই।’
২৩ বছর পর চারদিক রব উঠেছে সাফ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ঘরে রেখে দেওয়ার। দলেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। হামজাসহ বিশেষ করে বেশ কয়েকজন অরিজিন খেলোয়াড়ের অন্তর্ভুক্তি আশার পালে জোর হাওয়া দিচ্ছে। ঘরের মাঠ, চেনা কন্ডিশন এবং হাজারো সমর্থকের উপস্থিতি— সব চাপ জয় করে ট্রফি জেতার ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী তপু, ‘অবশ্যই ট্রফি জয়ের চাপ আছে। তবে আমার মনে হয়, যেখানে চাপ থাকবে, সেখান থেকেই ভালো ফল আসবে। আমাদের ফুটবলপ্রেমীরা কী চান, সেটা বুঝতে হবে। তারা চান আমরা ম্যাচ জিতি, ট্রফি জিতি। এবার আমরা তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। মাঠে তাদের সমর্থন চাই।’
ভুটানের বিপক্ষে হামজার অভিষেক ম্যাচে দলে ছিলেন না প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড় অধিনায়ক চেনচো গেইলশেন। আজ যখন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলবেন, সেখানে চেনচো থাকলেও থাকছেন না হামজা। ভুটানের জন্য এটা স্বস্তির হলেও দলটির অধিনায়কের মত ভিন্ন। বরং হামজার সঙ্গে খেলতে পারলে খুশিই হতেন। এ ব্যাপারে গতকাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে চেনচো বলেন, ‘গতবার চোটের কারণে আমি বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে পারিনি। তাই হামজা চৌধুরীর বিপক্ষেও খেলার সুযোগ হয়নি। এবারও হামজা খেলছেন না শুনে আমি খুশি নই। বরং আমি চাইতাম, তিনি খেলুন। হামজা দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের বড় তারকা। তার মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলা এবং তার কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য ভালো হতো।’
হামজার বিপক্ষে খেলতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও ট্রফি জেতার ব্যাপারে পরিষ্কার বার্তা দিয়ে রাখলেন ভুটানের অধিনায়ক চেনচো, আমরা অবশ্যই হামজাকে নিয়ে খেলতে চেয়েছিলাম। তবে প্রতিটি দলেরই স্বপ্ন থাকে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। আমরাও প্রথম ম্যাচ জিততে চাই। একই সঙ্গে সেমিফাইনালে যাওয়ার পথটা নিরাপদ রাখতে চাই।’ চেনচোর সুরে সুর মেলান দলটির কোচ গ্যারি ফিলিপস। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ভুটান কোচ বলেন, ‘আমাদের দলে অনেক তরুণ খেলোয়াড় আছে। চেনচোও দলের তরুণ খেলোয়াড়দের একজন। আমরা এই সুযোগ নিয়ে রোমাঞ্চিত। একই সঙ্গে সাফকে আমরা পরবর্তী এএফসি ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখছি।’
সাম্প্রতিক ফিফা আসিয়ান কাপে বাজে পারফরম্যান্স, র্যাঙ্কিংয়ে অবনতি, গোল স্কোরারের ঘাটতি- বাংলাদেশের ফুটবলে চিরচেনা আক্ষেপ। তবে সব ছাপিয়ে দেশের মাটিতে সাফ ট্রফি জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশা তপু, জামালদের।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে