গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ছবি : সংগৃহীত২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ভারতে। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ২৯১ রান সংগ্রহ করে আফগানিস্তান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৯১ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ( সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোট ৬ বার)। তখন জয় থেকে মাত্র তিন উইকেট দূরে আফগানিস্তান। কিন্তু ক্রিজে থাকা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল তখনও হার মানতে রাজি নন।
ক্র্যাম্প আর পিঠের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে পাল্টে দেন ম্যাচের চিত্রনাট্য। খেলেন অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। ১২৮ বলে ২১ চার ও ১০ ছক্কায় ২০১ রান করে ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নাম লেখান স্বর্ণাক্ষরে। সেই অবিস্মরণীয় ইনিংসের নায়ক ম্যাক্সওয়েল এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন।
গত বছরের জুনে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এবার টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেও অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৮ বছর বয়সি এই অস্ট্রেলিয়ান। পাশাপাশি প্রথম শ্রেণি ও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও আর খেলবেন না তিনি। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন ম্যাক্সওয়েল। বিগ ব্যাশ লিগে মেলবোর্ন স্টার্সের হয়ে খেলবেন। ২০২৭-২৮ মৌসুম পর্যন্ত দলটির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে তার।
১৯৮৮ সালের ১৪ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জন্ম ম্যাক্সওয়েলের। বাবা নিল ম্যাক্সওয়েল ছিলেন স্থানীয় ক্রিকেট আম্পায়ার ও ক্রিকেটের ভক্ত। বাবার কাছ থেকেই ছোটবেলায় ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। শুরুর দিকে উইকেটকিপার হিসেবেই খেলতেন তিনি। তবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তার শক্তিশালী থ্রো এবং বল করার সামর্থ্য নজর কাড়ে কোচদের।
তাদের পরামর্শে উইকেটকিপিং ছেড়ে অফ স্পিন বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে মনোযোগী হন ম্যাক্সওয়েল। ব্যাট হাতেও ছোটবেলা থেকেই ছিলেন আক্রমণাত্মক। প্রচলিত ব্যাটিংয়ের ব্যাকরণ মেনে খেলার চেয়ে বল পেলেই আক্রমণ করতে পছন্দ করতেন। এ কারণে জুনিয়র ক্রিকেটে অনেক সময় দ্রুত আউটও হয়েছেন। কোচদের বকুনি খেতে হয়েছে, কিন্তু নিজের সহজাত খেলার ধরন বদলাননি।
সেই সহজাত আক্রমণাত্মক ক্রিকেটই একসময় তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর ব্যাটারে পরিণত করে। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তার ব্যাটিং ছিল প্রতিপক্ষের জন্য বড় আতঙ্ক। অসম্ভবকে সম্ভব করার সামর্থ্য, উদ্ভাবনী শট আর মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৩০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ম্যাক্সওয়েল। এই সংস্করণে তার রান ২ হাজার ৮৯৭, যা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ। ১৫৪-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পাঁচটি সেঞ্চুরি রয়েছে তার। এই সংস্করণে সর্বোচ্চ পাঁচ সেঞ্চুরির বিশ্ব রেকর্ডে ভারতের রোহিত শর্মার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন ম্যাক্সওয়েল। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২০১৫ ও ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর মাঝে ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতেন ম্যাক্সওয়েল।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে বেশ কিছু দিন ধরেই আলোচনা চলছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ পডকাস্টে ম্যাক্সওয়েল বলেন, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ও পরে এ নিয়ে আমাদের বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো চাপ ছিল না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আপাতত দরজা খোলা রাখব। সামনে কয়েকটি সিরিজ ছিল, যেখানে দল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নতুনদের সুযোগ দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ সফরেও সেটি দেখা গেছে। নতুন ক্রিকেটাররা সুযোগ পেয়ে ভালো করেছে।’
ইংল্যান্ডের আসন্ন সাদা বলের সিরিজে মেলবোর্নে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ রয়েছে। নিজের ঘরের মাঠ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) বিদায়ি ম্যাচ খেলার ইচ্ছা ছিল ম্যাক্সওয়েলের। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হচ্ছে না। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এমসিজিতে বিদায়ি একটি ম্যাচ খেলার ছোট্ট আশা ছিল আমার।
তবে দল যে পথে এগোচ্ছে, সেটিও আমি বুঝতে পারছি। আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসে দলে অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। ২০২৮ সালের অলিম্পিক সামনে রেখে তরুণদের সুযোগ দেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপের সঙ্গে তাদের পরিচিত করানো দরকার, যা বিগ ব্যাশের মতো টুর্নামেন্টে সব সময় সম্ভব নয়।’
বিদায়ি ম্যাচের সেই ছোট্ট স্বপ্নের কথা জানিয়ে ম্যাক্সওয়েল আরও বলেন, ‘অনেক সময় নিজের নায়ক ও প্রিয় ক্রিকেটারদের ঘরের মাঠে বিদায় নিতে দেখে এমন স্বপ্ন তৈরি হয়। গত ১৫ বছরে এই সংস্করণকে নিজের ঘরের মতো মনে হয়েছে। তাই টি-টোয়েন্টিতে এমন একটি বিদায়ি ম্যাচের আশা করেছিলাম। অন্য কোনো সংস্করণে হয়তো এমনটা চাইতাম না।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ততা শেষ হওয়ায় এখন নিজের শরীরের যত্নে বেশি সময় দিতে চান ম্যাক্সওয়েল। বিগ ব্যাশের প্রস্তুতির জন্য হাঁটুতে ইনজেকশন নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা বন্ধ হওয়ার পর নিজের শরীরের যত্নে আরও বেশি সময় দিতে পারছি। বিগ ব্যাশের আগে আবারও আট সপ্তাহের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ক্যারিয়ারের বাকি টুর্নামেন্টগুলো খেলতে হলে এখন শরীরের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।’
গত ফেব্রুয়ারিতে ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়ে থাকল ম্যাক্সওয়েলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। সেই ম্যাচের মধ্য দিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় অস্ট্রেলিয়া।
এমসিজিতে বিদায়ি ম্যাচ খেলার ইচ্ছা পূরণ না হলেও ২০২৩ বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য দ্বিশতকসহ অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস তাকে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে বাঁচিয়ে রাখবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চ থেকে সরে গেলেও বিগ ব্যাশে ব্যাট হাতে দেখা যাবে এই অস্ট্রেলিয়ান তারকাকে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও