সরকারি আবাসন পরিদফতর। ছবি : সংগৃহীতসরকারি আবাসনের ফ্ল্যাটে অবৈধভাবে ভাড়াটে ও সাবলেট বাসিন্দা রাখার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভাড়াটে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের পর রাজধানীর মতিঝিল, আজিমপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন সরকারি কলোনি ছাড়ছেন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার মানুষ। তবে অল্প সময়ে বিকল্প আবাসন খুঁজে না পাওয়ায় অনেককে পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। অন্যদিকে সরকারি ফ্ল্যাটে এখনও ভাড়াটে বা সাবলেট বাসিন্দা রয়েছেন কি না তা খতিয়ে দেখতে চারটি তদন্ত দল মাঠে নেমেছে। সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হবে।
সরকারি আবাসন পরিদফতরের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) জহিরুল ইসলাম খান সময়ের আলোকে বলেন, তদন্ত দলগুলো প্রতিটি বাসায় গিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করছেন। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকারি বাসায় ভাড়াটে রাখার সঙ্গে জড়িত বরাদ্দপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুই সপ্তাহ পর থেকে এ পদক্ষেপ শুরু হতে পারে।
গত ২৯ অক্টোবর জারি করা জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে সরকারি আবাসন পরিদফতর জানায়, ৩১ অক্টোবরের পরও কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরিজীবীর বাসার বরাদ্দ বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি আবাসন পরিদফতরের অধীনে বড় ও ছোট মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে শুধু আজিমপুর এলাকাতেই রয়েছে ৩ হাজার ২৫২টি। আজিমপুর সরকারি কলোনির বিভিন্ন ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্স এবং ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাবলেট থাকতেন। তাদের বড় একটি অংশ ছাত্রী। আবাসিক হলে আসন না পাওয়া এবং তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশের আশায় তারা এসব কলোনিতে বসবাস করতেন।
আজিমপুর ও পলাশীর সরকারি কলোনি থেকে কয়েক দিনের মধ্যে শত শত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার ভাড়াটে বাসা ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অনেকেই এখনও বিকল্প বাসা খুঁজে পাননি। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বরাদ্দ পাওয়া বাসা ভাড়া দেওয়ার চর্চা চলে আসছিল। কেউ পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া দিতেন, আবার কেউ নিজের বাসার এক বা দুটি কক্ষ ভাড়া দিতেন। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ কম খরচে অন্যত্র বসবাস করে সরকারি বরাদ্দের বাসা ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করেন। আবার অনেকে বেতনের অর্থে সংসার চালাতে অসুবিধা হওয়ায় বাসার একটি বা দুটি কক্ষ ভাড়া দেন।
সরকারি আবাসন পরিদফতর রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি কলোনিতে পূর্ণ বা আংশিক ভাড়া দেওয়া বাসা চিহ্নিত করতে চারটি পরিদর্শন দল গঠন করেছে। পরিদর্শন দল-১ শাহজাহানপুর, মতিঝিল, খিলগাঁও, মালিবাগ, ইলিশিয়াম রেস্ট হাউস, গুলশান, বনানী ও উত্তরা এলাকায় কাজ করছে। দল-২ ইস্কাটন গার্ডেন, নিউ ইস্কাটন, বেইলি রোড, বেইলি স্কয়ার, সোবহানবাগ ও সার্কিট হাউস এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। পরিদর্শন দল-৩ আজিমপুর, পলাশী, মৌচাক কলোনি, চায়না বিল্ডিং, রায়েরবাজার, ঝিগাতলা ও মিরপুর এলাকায় কাজ করছে। অন্যদিকে দল-৪ মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি, এলেনবাড়ী, মগবাজার, আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় পরিদর্শন করছে।
পরিদর্শন দলগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার আবাসিক ভবন, পূর্ণ ভাড়া ও সাবলেট দেওয়া বাসা চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভবনের আঙিনা, চলাচলের পথ, ড্রেনেজ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে পরিচালকের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সরকারি আবাসন পরিদফতরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান বলেন, সাবলেট বা ভাড়াটে হিসেবে থাকা ব্যক্তিদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাসা ছাড়তে বলা হয়েছিল। এখন পরিদফতরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারি কলোনি পরিদর্শন করছেন। কোনো ফ্ল্যাটে ভাড়াটে বা সাবলেট বাসিন্দা পাওয়া গেলে বরাদ্দ পাওয়া সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অধিকাংশ ভাড়াটে ইতিমধ্যে বাসা ছেড়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বাসা ছাড়ার জন্য সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহ সময় পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা বলেও জানান তিনি।
আজিমপুর সরকারি কলোনির জোন-বি’র ২২ নম্বর ভবনের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম সাংবাদিকদের জানান, ভবনের কয়েকটি বাসায় কক্ষ ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে ইতিমধ্যে ভাড়াটেদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনো ভাড়াটে নেই।
মিরপুর-১ নম্বরের ওয়াক-আপ সরকারি কর্মচারী আবাসন এলাকার পুরোনো পাঁচ তলা ভবনগুলোর কয়েকটি ফাঁকা বাসা গণপূর্ত অধিদফতর (পিডব্লিউডি) সিলগালা করেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের ভাষ্য, অনেক বাসিন্দা ইতিমধ্যে সামনের নতুন বহুতল ভবনে চলে গেছেন।
তবে সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়ার অনিয়ম বন্ধের উদ্যোগের বিরোধিতা না করলেও বাসা ছাড়ার জন্য আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, মাত্র সাত দিনের মধ্যে নতুন বাসা খুঁজে সেখানে ওঠা কঠিন। বিশেষ করে যারা পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকেন এবং আবাসিক হলে আসন পাননি, তাদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও জটিল।
সরকারি আবাসন পরিদফতরের গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিদফতরের পরিদর্শন দলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক ফ্ল্যাট বা বাসার বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি বেআইনিভাবে বরাদ্দের এক বা একাধিক কক্ষ অথবা পুরো ফ্ল্যাট অন্যের কাছে সাবলেট ভাড়া দিয়েছেন। এ ধরনের কাজ ‘১৯৮২ সালের বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা’র স্পষ্ট লঙ্ঘন। ভবিষ্যতে কোনো অবস্থাতেই বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে সাবলেট ভাড়া দেওয়া যাবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের পর কোনো বাসায় সাবলেট ভাড়াটে পাওয়া গেলে কারণ দর্শানো ছাড়াই সংশ্লিষ্ট বাসার বরাদ্দ বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিধিমালার ১৪ (৩) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অফিসপ্রধান ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হবে।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আকস্মিকভাবে আজিমপুর কলোনির বি জোন পরিদর্শনে যান। সেখানকার নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় উপস্থিত লোকজন সাবলেট ভাড়াটেদের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। পরে কলোনির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও উন্নত রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে