মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধান

আনিকা বিনতে আজিজ

ইসলাম

বর্তমান সময়ে একজন তরুণের হাতে স্মার্টফোন, সামনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল জগৎ, আর চারপাশে নিজেকে অন্যের মতো করে গড়ে তোলার অসংখ্য

2026-11-06T12:16:02+00:00
2026-11-06T12:16:02+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ইসলাম
মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধান
আনিকা বিনতে আজিজ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বর্তমান সময়ে একজন তরুণের হাতে স্মার্টফোন, সামনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল জগৎ, আর চারপাশে নিজেকে অন্যের মতো করে গড়ে তোলার অসংখ্য প্রলোভন। পোশাক, ভাষা, জীবনযাপন কিংবা সাফল্যের সংজ্ঞা— সবকিছুতেই অনলাইন প্রবণতা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। আধুনিকতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া দোষের নয়; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বসংস্কৃতি থেকে শেখা সময়ের দাবি। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন অন্যের জীবনধারাকে অনুসরণ করতে গিয়ে নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তুচ্ছ করা হয়। মুসলিম তরুণদের জন্য তাই আজ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আধুনিকতার সঙ্গে এগিয়ে গিয়েও কীভাবে ইসলামি পরিচয় ও শালীনতা অক্ষুণ্ন রাখা যায়?

কৈশোর ও তারুণ্য নিজের পরিচয় নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে বন্ধুমহলের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো তরুণ বন্ধুমহলে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজের পোশাক, কথাবার্তা কিংবা আচরণ বদলে ফেলছে; কেউ আবার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলাকে পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ মনে করে তা আড়াল করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের জীবনযাপন দেখে অনেকে নিজের বাস্তবতা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। লাইক, মন্তব্য ও অনুসারীর সংখ্যা যেন আত্মমূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে ওঠে।

এখানে সমস্যা আধুনিক পোশাক, বিনোদন কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারে নয়; সমস্যা হলো বিবেচনাহীন অনুকরণে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ১৩)। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বাহ্যিক চাকচিক্য, সামাজিক পরিচিতি কিংবা জনপ্রিয়তায় নয়; বরং তার নৈতিকতা, আল্লাহ সচেতনতা ও সৎকর্মে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৩১)। হাদিসটির আলোচ্য বিষয় বুঝতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা জরুরি; একে ব্যবহার করে অন্য সংস্কৃতির প্রতিটি বিষয়কে অন্ধভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ঠিক নয়। বরং মুসলিমের বিশ্বাস, স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনুকরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ইসলামে শালীনতা ব্যক্তির সামগ্রিক আচরণ ও চরিত্রের অংশ। পোশাকের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গি, কথাবার্তা, অনলাইন আচরণ এবং অন্যের প্রতি সম্মানও এর অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে প্রথমে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে ও পবিত্রতা রক্ষা করতে বলা হয়েছে; এরপর মুমিন নারীদেরও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা আন-নুর, আয়াত : ৩০-৩১)। অর্থাৎ শালীনতার দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৫)। এই লজ্জাশীলতা মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে শেখায় এবং আচরণে সংযমী করে। তাই অনলাইনে অশালীন মন্তব্য, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের দায়িত্বহীন প্রকাশ কিংবা অন্যকে অপমান করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা— এসবকেও নৈতিকতার আলোকে বিবেচনা করা জরুরি।

আত্মপরিচয়ের সংকটের আরেকটি দিক হলো ধর্মীয় জ্ঞানের ঘাটতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও নানা ফতোয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়; কখনো আয়াতের প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া হয়, কখনো দুর্বল বা জাল হাদিসকে সহিহ বলে প্রচার করা হয়, আবার কখনো ব্যক্তিগত মতামতকে ইসলামের চূড়ান্ত বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে যাচাই না করে এসব বিশ্বাস করলে তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি, অযথা কঠোরতা কিংবা ধর্ম সম্পর্কে অনীহা তৈরি হতে পারে। পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো সংবাদ পেলে তা যাচাই করতে, যাতে অজ্ঞতাবশত কারও ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয় (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)। আয়াতটি সংবাদ যাচাইয়ের বিষয়ে হলেও এর শিক্ষা ডিজিটাল যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় কোনো বক্তব্য গ্রহণ বা প্রচারের আগে নির্ভরযোগ্য তাফসির, স্বীকৃত হাদিসগ্রন্থ এবং যোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা দেখা উচিত। শুধু আবেগপূর্ণ বক্তব্য কিংবা ভাইরাল ভিডিওকে জ্ঞানের বিকল্প ভাবা যায় না।

উত্তরণের উপায় হিসেবে প্রথমত তরুণদের ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অর্থসহ জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু নিষেধের তালিকা মুখস্থ নয়, বরং প্রতিটি নির্দেশের উদ্দেশ্য ও নৈতিক তাৎপর্য বোঝা জরুরি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান’ (সুরা আজ-জুমার, আয়াত : ৯)। জ্ঞান অর্জনের এই গুরুত্ব তরুণদের ধর্মীয় বিষয়ে সচেতন হতে এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ইসলাম জানার অনুপ্রেরণা দেয়। দ্বিতীয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া ধর্মীয় বক্তব্য যাচাই না করে বিশ্বাস বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৬)। তাই কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় বিধান কিংবা কোনো ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণের আগে নির্ভরযোগ্য তাফসির, স্বীকৃত হাদিসগ্রন্থ ও যোগ্য আলেমের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণরা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের প্রশ্ন ও সংশয় নিয়ে কথা বলতে পারে। বন্ধুমহলের চাপের মুখেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে; সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)। তাই এমন বন্ধু ও সঙ্গ বেছে নেওয়া জরুরি, যারা ভালো কাজে উৎসাহিত করে, নৈতিকতা রক্ষায় সহযোগিতা করে এবং ভুল পথে গেলে সংশোধনের পরামর্শ দেয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই
  বিষয়:   ইসলাম  মুসলমান 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: