ঝিনাইগাতির গারো পাহাড় খুঁড়ে উত্তোলন করা হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ বালু ও পাথর। ছবি : সময়ের আলো সবুজে ঘেরা পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী, স্বচ্ছ জলধারা আর ছোট-বড় ঝরনার অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের বুক চিরেই চলছে পাহাড়ের ভূ-গর্ভস্থ এবং নদী-ঝরনা থেকে অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনের সম্ভাবনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে, গর্ত খুঁড়ে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু উত্তোলন করছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। উত্তোলিত পাথর-বালু দিনের বেলায় বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে রাতের আঁধারে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকযোগে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং অবৈধ পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর-বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু সংগ্রহ করছেন।
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, এভাবে পাহাড় কাটা এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভূমিরূপ পরিবর্তিত হবে। ব্যাহত হবে নদী ও ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহ। ধ্বংস হতে পারে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য। একই সঙ্গে পর্যটকদের আকর্ষণ হারাবে গারো পাহাড়। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পাথর-বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র গাড়ি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তোলনকারীদের হামলায় ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী ফরেস্ট বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ ও জিয়াউর রহমান নামে এক বনপ্রহরী আহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে বন বিভাগের তৎপরতা কমে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
গারো পাহাড় শুধু পাথর-বালুর উৎস নয়; এটি শেরপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই পাহাড়, নদী ও ঝরনার স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. হাবিবউল্লাহ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী ফরেস্ট বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ বলেন, নদীর বালু জেলা প্রশাসনের আওতাধীন। তাই বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা প্রয়োজন।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, কোনোভাবেই প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যয় হতে দেওয়া হবে না। আমরা মোবাইল কোর্ট আরও বৃদ্ধি করব। এছাড়াও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
সময়ের আলো/এনএন