প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত বছরখানেক আগে দেশে ফেরা তারেক রহমান এই প্রথম কোনো শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এবারের উপলক্ষ ছিল জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস।
গতকাল রাজধানীতে বর্ণাঢ্য এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বেলা সোয়া ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ থেকে সার্বভৌমত্ব র্যালির উদ্বোধন করেন তিনি। পরে তাতে শামিল হন সরকারপ্রধান।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২১ বছর আগে ২০০৫ সালে এমনই এক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন দলের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই শোভাযাত্রায়। ২১ বছর পর আবারও রাজপথের শোভাযাত্রায় পা মেলালেন তিনি। তবে এবার তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান নন, দেশের প্রধানমন্ত্রীও।
ক্ষমতাসীন দলের এ কর্মসূচি ঘিরে কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে ফকিরের পুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থকের ঢল জনসমুদ্রে রূপ নেয়। সাধারণ উৎসুক জনতাও সড়কের দুই ধারে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। বিভিন্ন ভবনের ছাদে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখে হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর পরনে ছিল সাদা হাফ হাতা শার্ট আর ধূসর রঙের প্যান্ট। পায়ে ছিল গাঢ় নীল কেডস। প্রধানমন্ত্রীর এ দীর্ঘ চলার পথে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আমান, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুসহ অনেক নেতা ছিলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর হাঁটতে কষ্ট হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সামনে ছিলেন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা।
নেতাকর্মীদের হাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড শোভা পায়। নেতাকর্মীরা বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। শোভাযাত্রা শুরুর বেশ আগে দুপুর ১২টা থেকে ছোট ছোট মিছিল থেকে নয়াপল্টন ও তার আশপাশের এলাকায় আসতে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা বাদেও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন এ কর্মসূচিতে। ট্রাক ও বাসে করে তারা ঢাকায় আসেন। সামরিক ট্যাঙ্কের আদলে তৈরি একটি গাড়ির ওপর বসানো ছিল কামানের প্রতিকৃতি। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যাঙ্গ করে কিছু প্রদর্শনী শোভা পায় নয়াপল্টনে।
সামাজিকমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এই হাঁটার দৃশ্য ভাইরাল হয় মুহূর্তেই। নেটিজেনরা প্রশংসা করে বলেন, এভাবে কোনো প্রধানমন্ত্রীর টানা হাঁটার দৃশ্য বাংলাদেশে নজিরবিহীন ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী তারা বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করছেন। খাল খনন কর্মসূচিতে গিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন জিয়াউর রহমান। যা তখনও বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
শোভাযাত্রাটি কাকরাইল মোড়, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের পাশ দিয়ে রমনা পার্ক সড়ক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় হয়ে বাংলামোটর, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হয়। যেখানে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে উন্মুক্ত কনসার্ট। দেশবরেণ্য খ্যাতনামা শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন। তাদের গান উপভোগ করেন হাজারো দর্শকশ্রোতা।
সরকারপ্রধান সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে শোভাযাত্রা শুরু করেন বেলা সোয়া ৩টায়। ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার হেঁটে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পৌঁছান সাড়ে ৪টায়।
বক্তব্যে দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে মন্তব্য করে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। আজকে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব র্যালি হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিন, আজকের এই র্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন। একই সঙ্গে যে গণতন্ত্রকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই গণতন্ত্রকে রক্ষার দিন হোক।
নেতাকর্মীদের কাছে সমর্থন চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে আছেন? এ সময়ে নেতাকর্মী-সমর্থকরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে আনেনি, দেশের মানুষ সেই স্বৈরাচার, সেই ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে দেশের মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় স্লোগান দেন, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কেনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে