গ্রাফিক : সময়ের আলো পবিত্রতা ঈমানি জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নামাজসহ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের জন্য ওজু একটি মৌলিক শর্ত। ওজুর মাধ্যমে একজন মুসলিম বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি মহান আল্লাহর দরবারে ইবাদতের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু এই পবিত্র ইবাদত সম্পাদন করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা পানির অপচয় করে থাকি। অথচ ইসলাম পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি পানির পরিমিত ব্যবহার, সংযম ও ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে ওজুতে অল্প পানি ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত রয়েছে, তা আজকের পানি সংকট ও পরিবেশগত বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ওজুতে পানির ব্যবহার সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা জানা এবং তা বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।
পানির অপচয় নিষিদ্ধ : মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা পানাহার করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৭)।
এ আয়াতের শিক্ষা হলো, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় পরিহার করা আবশ্যক। পানি মহান আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। ওজুর মতো পবিত্র ইবাদতেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।
ওজুতে পানির পরিমিত ব্যবহার : পানি ব্যবহারে সংযমের সর্বোত্তম আদর্শ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক মুদ (৮০০ গ্রাম তরল) পরিমাণ পানি দিয়ে ওজু করতেন এবং এক সা থেকে পাঁচ মুদ পরিমাণ পানি দিয়ে গোসল করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০১)। এক সা সমান চার মুদ। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, অল্প পানিতেও যথাযথভাবে ওজু করা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ আমল আমাদের পানি ব্যবহারে পরিমিতিবোধ ও সংযমের শিক্ষা দেয়।
ওজুর অঙ্গ তিনবার ধোয়া সুন্নাহ : ওজুর অঙ্গগুলো একবার ধোয়া ফরজ এবং তিনবার ধোয়া সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো একবার, কখনো দুবার এবং কখনো তিনবার ওজুর অঙ্গ ধুয়েছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৭)। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ওজুর ক্ষেত্রে তিনবার ধোয়া সুন্নাহসম্মত পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি। তবে তিনবারের বেশি অযথা ধোয়া সুন্নাহর অনুসরণ নয়। তাই ওজুর প্রতিটি অঙ্গ যথাযথভাবে ধুয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত।
ওজুতে সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি পরিহার : হজরত আমর ইবনে শুআইব (রা.) তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে ওজু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তাকে তিনবার করে ওজু করার পদ্ধতি দেখান। এরপর বলেন, ‘এভাবেই ওজু করবে। যে এর চেয়ে বেশি করল, সে সীমালঙ্ঘন করল, বাড়াবাড়ি করল এবং জুলুম করল’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৫)। এ হাদিস ওজুর ক্ষেত্রে সুন্নাহর সীমারেখা মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ওজুর অঙ্গ বারবার ধোয়া কিংবা অযথা পানি ঢালা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
প্রবহমান নদীর তীরেও অপচয় নয় : পানি সহজলভ্য হলেই তা ইচ্ছামতো ব্যবহার করার সুযোগ নেই। একটি বহুল আলোচিত বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ (রা.)-কে ওজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে অপচয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেন। তিনি জানতে চান, ওজুতেও কি অপচয় হতে পারে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রবহমান নদীর তীরে থাকলেও’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫)। বর্ণনাটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে এর শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পানির প্রাচুর্য থাকলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
ওজুর সময় কল বন্ধ রাখার অভ্যাস : বর্তমানে অধিকাংশ মসজিদ ও বাসাবাড়িতে কলের মাধ্যমে ওজু করা হয়। অনেকেই ওজুর প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় কল সম্পূর্ণ খুলে রাখেন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পানি নষ্ট হয়। অথচ ওজুর অঙ্গ ধোয়ার প্রয়োজন না থাকলে কল বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনমতো পানি প্রবাহিত করা সহজেই সম্ভব। ছোট্ট এই অভ্যাস ব্যক্তিগত পর্যায়ে পানির অপচয় কমানোর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
পানি সংরক্ষণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব : পানি শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপকরণ নয়, এটি সৃষ্টিজগতের জন্য মহান আল্লাহর এক গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। পৃথিবীর মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ— সবাই পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই পানির অপচয় রোধ করা শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, সেখানে পানির পরিমিত ব্যবহার আরও বেশি জরুরি।
মসজিদ-মাদরাসায় সচেতনতা সৃষ্টি : মসজিদ ও মাদরাসা শুধু ইবাদত ও শিক্ষার কেন্দ্র নয়; এগুলো নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই ওজুখানায় পানির অপচয় রোধে সচেতনতামূলক নির্দেশনা, কলের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় তদারকির ব্যবস্থা থাকা উচিত। ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জুমার খুতবা, ওয়াজ-নসিহত ও পাঠদানের মাধ্যমে এ বিষয়ে মুসল্লি ও শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে পারেন।
ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যেখানে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সংযম ও ভারসাম্য পরস্পরের পরিপূরক। ওজুতে পানির পরিমিত ব্যবহার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। ইবাদতের নামে অপচয় নয়, বরং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জনই একজন মুমিনের দায়িত্ব। তাই আসুন, ওজুতে পানির অপচয় বন্ধ করি, নিজেরা সচেতন হই এবং পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সচেতনতা ছড়িয়ে দিই। মনে রাখতে হবে, পানির প্রতিটি ফোঁটা মূল্যবান; এর সঠিক ব্যবহার শুধু ধর্মীয় নির্দেশনার অনুসরণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলারও অঙ্গীকার।
লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়