মাদারীপুরের শতাধিক তরুণ বর্তমানে লিবিয়ায় বন্দী অবস্থায় রয়েছেন। ছবি : সংগৃহীত ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মেহেদী হাসান। সেখানে পৌঁছানোর কয়েক মাসের মধ্যে তিনি মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দী হন বলে পরিবারের অভিযোগ। ছেলেকে মুক্ত করতে জমি বিক্রি ও বসতভিটা বন্ধক রেখে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয় পরিবার। কিন্তু মুক্তির মাত্র ১০ দিনের মাথায় আবারও বন্দী করা হয় তাকে। এবার দাবি করা হচ্ছে আরও ২০ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ছেলেকে মুক্ত করতে ৩৯ লাখ টাকা জোগাড় করেছে পরিবারটি। সন্তানের জীবন বাঁচাতে গিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে তারা।
মেহেদীর মতো একই পরিণতির শিকার হয়েছেন মাদারীপুরের আরও অনেক তরুণ। কেউ মাসের পর মাস নিখোঁজ, কেউ লিবিয়ায় বন্দী অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, আবার কারও ফিরছে নিথর দেহ। স্বজনদের অভিযোগ, বন্দী তরুণদের নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করছে চক্রটি। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে অনেক পরিবার হারাচ্ছে শেষ সম্বলটুকুও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদারীপুরের শতাধিক তরুণ বর্তমানে লিবিয়ায় বন্দী অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে নিখোঁজ। গত ছয় মাসে লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মামলা হলেও মূল হোতাদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে স্থানীয় দালাল সাগর ও আবু তালেবের মাধ্যমে ২২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া যান শিবচরের বাঁশকান্দি এলাকার মেহেদী হাসান। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে পৌঁছানোর তিন মাস পর তাকে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করা হয়। কিন্তু মাত্র ১০ দিন পর আবারও বন্দী হন মেহেদী। এবার তাকে মুক্ত করতে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে জমি বিক্রি ও বসতভিটা বন্ধক রেখে ৩৯ লাখ টাকা দিয়েছেন স্বজনেরা। তাদের অভিযোগ, বন্দী অবস্থায় মেহেদীর ওপর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
মেহেদীর মা বলেন, আমার ছেলেকে এখন চেনাই যায় না। হাত-পায়ের নখ তুলে ফেলেছে। ঠিকমতো খেতেও দেয় না। মাঝে মাঝে মারধর করার সময় ভিডিও কল দেয়। ছেলেকে বাঁচাতে আমরা সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আর টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য নেই।
একই উপজেলার ভান্ডারীকান্দি এলাকার ১৮ বছর বয়সী লিমন ইসলামও ইতালি যাওয়ার আশায় দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় গেছেন। ২৫ লাখ টাকা চুক্তির বিপরীতে ২৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে গত ৪ এপ্রিল বাড়ি ছাড়েন তিনি। দুই মাস লিবিয়ায় অবস্থানের পর ১৪ জুন পরিবারের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। এরপর থেকে চার মাস ধরে নিখোঁজ লিমন। সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা তার পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ, লিমনকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে যিনি টাকা নিয়েছেন, সেই দালাল এখন ফোনও ধরছেন না।
লিমনের মা বলেন, আমার ছেলের সঙ্গে অনেক দিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। দালাল এখন ফোনও ধরে না। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই।
অন্যদিকে, সদর উপজেলার ছিলারচর এলাকার তুহিন ব্যাপারী পাঁচ মাস লিবিয়ার কারাগারে বন্দী থাকার পর দেশে ফিরেছেন। তার হাত-পায়ের নখ তুলে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বন্দী অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। লিবিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা এবং সেখানে বন্দী অন্য তরুণদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন তুহিন।
সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর গ্রামের মাছুমের পরিণতি আরও মর্মান্তিক। মৃত আব্দুল সত্তার আকনের ছেলে মাছুম ঢাকার তিতুমীর কলেজ থেকে ২০২৪ সালে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্থানীয় দালাল দেলোয়ার সরদার ও সুমন সরদারের প্রলোভনে পড়ে ২৫ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, তাকে লিবিয়ায় নিয়ে বন্দী করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
ছেলেকে বাঁচাতে পরিবারটি ৩১ লাখ টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত মাছুমকে রক্ষা করা যায়নি। স্বজনদের অভিযোগ, দালাল চক্রের নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। এখন সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে মা রানু বিবির। মাছুমকে হত্যা মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেফতার করেছে। বাকি আসামিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রানু বিবি বলেন, আমার ছেলের লাশটা আমারে ফিরায়ে দেন।
শুধু মেহেদী, লিমন, তুহিন কিংবা মাছুম নন, মাদারীপুরের আরও অনেক তরুণ একইভাবে দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় গিয়ে বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কারও পরিবারের কাছে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। সন্তানের জীবনের ঝুঁকির কথা ভেবে অনেক পরিবার দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করতেও সাহস পাচ্ছে না। যেসব পরিবার মামলা করছে, তাদের অভিযোগ, অভিযানে সহযোগী দালালেরা গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে স্থানীয় দালালেরা তরুণদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেন। পরে বিভিন্ন পথে তাদের লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তাদের আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অভিযোগ পেলে পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। তবে মূল আসামিরা দেশের বাইরে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের আটক করা সম্ভব হয় না। গ্রেফতার হওয়া আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে সে বিষয়ে পুলিশের কিছু করার থাকে না। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি আদালতের।
সচেতন মহলের মতে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধে পরিবার ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বপ্নের ইতালি এখন মাদারীপুরের অনেক পরিবারের কাছে দুঃস্বপ্নের নাম। কোথাও নিখোঁজ সন্তানের অপেক্ষায় কাটছে দিন, কোথাও মুক্তিপণের টাকা জোগাতে বিক্রি হচ্ছে শেষ সম্বল, আবার কোথাও সন্তানের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন মা-বাবা। অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা বন্ধ এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে এমন দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
সময়ের আলো/এনএন