জরিমানার মাস না পেরোতেই ফের শুরু অনুমোদনহীন ভবনের নির্মাণকাজ

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

সারাদেশ

ময়মনসিংহের ত্রিশালে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নকশা অনুমোদন ছাড়াই সাততলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের দায়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল ভবন মালিক

2026-11-08T15:25:59+00:00
2026-11-08T15:26:54+00:00
 
  রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
জরিমানার মাস না পেরোতেই ফের শুরু অনুমোদনহীন ভবনের নির্মাণকাজ
নেই লিখিত কাগজ, অসংগতি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম  আপডেট: ০৮.১১.২০২৬ ৩:২৬ পিএম
জরিমানার কয়েক মাস না পেরোতেই একই ভবনে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ছবি : সময়ের আলো
ময়মনসিংহের ত্রিশালে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নকশা অনুমোদন ছাড়াই সাততলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের দায়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল ভবন মালিক প্রদীপ মোদককে। গত ১৫ জুলাই এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় এ জরিমানা করেন। তবে জরিমানার কয়েক মাস না পেরোতেই একই ভবনে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় ভবনটির নকশা অনুমোদন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ত্রিশাল পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রদীপ মোদক। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নকশা অনুমোদন ছাড়াই তিনি সাততলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও সম্প্রতি ভবনটিতে নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন তিনি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ভবনটির নির্মাণকাজের অনুমোদন মিলেছে কোথা থেকে।

ভবন মালিক প্রদীপ মোদকের দাবি, পৌরসভার অনুমতি নিয়েই তিনি নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। তবে অনুমোদনের পক্ষে কোনো লিখিত কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুন বিসি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ভবনটির নকশা অনুমোদনের বিষয়ে ১৫ জুলাই জরিমানার পর নতুন করে কোনো অনুমোদনসংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ভবনটির অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে, ভবনটির অনুমোদন ও নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অনিয়ম আড়াল করার গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট একটি চক্র আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

পৌরসভার নকশাকারক আরেফিন জনি বলেন, লিখিত নয়, সাবেক প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরফাত সিদ্দিকী মৌখিকভাবে অনুমোদন দিয়েছেন। মৌখিকভাবে কোনো ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।

অন্যদিকে পৌরসভার প্রকৌশলী লুৎফুল ইসলাম বলেন, ভবনটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই মালিক নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। তবে কে অনুমোদন দিয়েছেন কিংবা কত তারিখে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে— এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি। তার ভাষ্য, সর্বশেষ অনুমোদনসংক্রান্ত সভায় মৌখিক আলোচনা হয়েছিল, ভবন মালিক প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিলে অনুমোদন পাবেন।

এদিকে ভবনটির অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির এক কারিগরি সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গত ১৬ জুন বিসি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সম্ভবত প্রথম ফাইলটিই ছিল প্রদীপ মোদকের। ফাইলটিতে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না থাকায় সর্বসম্মতিক্রমে তা বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় এক মাস পর, ১৫ জুলাই, ভ্রাম্যমাণ আদালত ভবনটিতে অভিযান পরিচালনা করেন। এখন পর্যন্ত নতুন করে বিসি কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই ভবনটির নকশা অনুমোদনের সুযোগ নেই।

বিসি কমিটির কারিগরি সদস্য ও ত্রিশাল ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান বলেন, প্রদীপ মোদকের ভবনে প্রয়োজনীয় ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ না থাকায় তারা অনুমোদন দিতে পারেননি। এ কারণে গত ১৫ জুলাই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হয় এবং ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বিসি কমিটির আর কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে চারতলা ভবনে ওঠানামার জন্য দুটি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু প্রদীপ মোদকের ভবনে এ নিয়মও অনুসরণ করা হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ময়মনসিংহ জেলার সদস্যসচিব পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল বলেন, বিসি কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ভবনের অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য ত্রিশাল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম মারাত্মক অন্তরায়। যথাযথ অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করা স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন এবং সুশাসনের প্রতি অনীহার বহিঃপ্রকাশ।

তিনি আরও বলেন, টেকসই ও নিরাপদ নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ত্রিশালের মতো ক্রমবর্ধমান জনপদে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

ত্রিশাল পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ হাসনাত জাহান খান বলেন, বিসি কমিটির সভা ছাড়া মৌখিকভাবে কোনো ভবনের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি দায়িত্ব গ্রহণের আগে একটি বিসি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সভার রেজুলেশনের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেসব অনুমোদনপত্রে আমি স্বাক্ষর করেছি। তবে প্রদীপ মোদকের ভবনটি ওই অনুমোদনের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। এজন্য নথিপত্র যাচাই করে দেখতে হবে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত কোনো বিসি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।

একই ভবনের অনুমোদন নিয়ে ভবন মালিক, পৌরসভার নকশাকারক ও প্রকৌশলীর বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে ভবন নির্মাণের জন্য এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল, সেই ভবনেই আবার নির্মাণকাজ শুরু হলো কীভাবে।

এ অবস্থায় সাততলা বাণিজ্যিক ভবনটির নকশা আদৌ অনুমোদিত হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কোন কর্তৃপক্ষ, কবে এবং কী প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দিয়েছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   ময়মনসিংহ  ত্রিশাল  কর্তৃপক্ষ  নকশা  অনুমোদন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: