শহীদ বদিউল আলম, বীর বিক্রম সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি

কাজী মোহাম্মদ আলী আনোয়ার

সম্পাদকীয়

বদিউল আলম, ডাকনাম তপন হলেও আমাদের বন্ধুমহল, বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধক্ষেত্রÑ সর্বত্র সে বদি নামেই পরিচিত ছিল। বদির সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬১

2019-06-26T00:00:00+00:00
2019-06-26T00:00:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
শহীদ বদিউল আলম, বীর বিক্রম সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি
কাজী মোহাম্মদ আলী আনোয়ার
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ৪১৩)
বদিউল আলম, ডাকনাম তপন হলেও আমাদের বন্ধুমহল, বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধক্ষেত্রÑ সর্বত্র সে বদি নামেই পরিচিত ছিল। বদির সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬১ সালে, যখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। বদির ছোট ভাই ফজলুল আলম (সেলিম) আমার সহপাঠী ছিল। বদির সঙ্গে পরিচয় থাকলেও তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি কারণ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে এক বছরের সিনিয়র হলেও অনেক সিনিয়র, তাই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ছিল না। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলাম। একই বিভাগে বদি আমার এক বছরের সিনিয়র ছিল। সেখানে দেখা সাক্ষাৎ হতো, আড্ডা দেওয়ারও যথেষ্ট সুযোগ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে বদি ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এনএসএফ) সঙ্গে যুক্ত ছিল কিন্তু আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না। বদি বীপবঢ়ঃরড়হধষষু নৎরষষরধহঃ ছিল, প্রচুর বই পড়ত। সাধারণত সে কথা কম বলত, হয়তো নিজের সার্কেলের মধ্যে কথা বলত।
প্রকৃতপক্ষে ঘনিষ্ঠতা বলতে যা বোঝায় বদির সঙ্গে সেটা আমার গড়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কিশোরগঞ্জ এবং জাওয়ারে। মে হতে জুলাই মাস পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে থাকতাম, খেতাম। সেখানে আমরা বেশ কিছু অপারেশন করেছিলাম। আহামরি কিছুু করতে পারিনি তবে সে সময়ের প্রেক্ষিতে অপারেশনগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব¡ ছিল। আমাদের দলে ছিল বদি, তার জজ মামা, মুশতাক মামা, খালেদ মামা, মনু (সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা), আমি আর স্থানীয় এক ছেলে জহির উদ্দিন। আমাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করত বদির ছোট ভাই সেলিম, সাজু (বদির খালাতো ভাই), তারেক মামা। আমরা অনুধাবন করতে পারছিলাম যে, আমাদের লোকবল বাড়াতে হবে, অস্ত্র বাড়াতে হবে। অস্ত্র জোগাড়ের উদ্দেশ্যে আমরা একবার তাড়াইল থানা ঘেরাও করলাম। ওসিকে রুমে পাওয়া গেল। কিন্তু তেমন লাভ হলো না। রাইফেলের বোল্ট খোলা ছিল। তখন আমাদের সামগ্রিক কর্মকাÐ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। প্রশিক্ষণ নেই, অভিজ্ঞতা নেই, প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি নেই। শুধু তাই নয়, কোনো ভবিষ্যৎ চিন্তা, পরিকল্পনা কিছুই ছিল না। যাই হোক, আমরা জানতে পারলাম সার্কেল অফিসারের কাছে একটা পয়েন্ট টু টু রাইফেল আছে। এটা তখন আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয় ছিল। তড়িঘড়ি তার বাসা ঘেরাও করা হলো। বদি ভেতরে গেল, আমরা সব বাইরে অবস্থান করছিলাম। সার্কেল অফিসার তো কেঁদে কেটে এক সার, জানাল তার কাছে এ অস্ত্র নেই, কোনো কালে ছিলও না। আমাদের অস্ত্রশস্ত্র বলতে ছিল একটা পিস্তল, একটা শটগান, চারটা থ্রি নট থ্রি, রাইফেল, চারটা গ্রেনেড এবং কিছু গুলি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের একটি ঘটনাÑ যেটা আমি যতদিন বেঁচে থাকব আমার স্মরণে থাকবে। আমি তখন মোহাম্মদপুরে ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের পেছনে থাকতাম। ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতের পর আমরা তখন পুরোপুরি হতবুদ্ধি। ১৯৭১ সালে ক্র্যাকডাউনের পর ২৭ মার্চ কারফিউ তোলা হলে যতদূর মনে পড়ে, আমি ধানমন্ডি গিয়েছিলাম। বদির একটা মোটরবাইক ছিল। সেও মোটরবাইক নিয়ে হাজির হলো সেখানে।
বদি বলল, কী করছ?
বললাম, কী করার আছে?
বদি বলল, ওহলঁংঃরপব রং নবরহম ফড়হব ঃড় ঁং. অহফ বি পধহ’ঃ ঃধশব রঃ ষুরহম ফড়হি. ডব যধাব ঃড় ৎবঃধষরধঃব.
বললাম, ঝড়সবনড়ফু যধং ঃড় ফড় ংড়সবঃযরহম ধনড়ঁঃ রঃ.
বদি বলল, ণবং, ঃযধঃ ংড়সবনড়ফু যধং ঃড় নব ুড়ঁ ড়ৎ সব.
ওই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত কী হচ্ছে, কী করতে হবে, কী করা যায় সেই বিষয়ে আমার কোনো স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না। বদিই আমাকে সর্বপ্রথম আমাদের করণীয় সম্পর্কে একটা সূত্র ধরিয়ে দিয়েছিল সেদিন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আরেকটি ঘটনা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। আমরা একবার কিশোরগঞ্জ থেকে পাকুন্দিয়া গেলাম, বদির দাদাবাড়ি। খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর খালু (বদির বাবা) আমাকে বললেন, বদির মায়ের সঙ্গে কথা বলে যেতে। গেলাম ভেতরে। খালা বসতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোরা কী করছিস?
বললাম, কী আর করব? যা করা উচিত বলে আমাদের মনে হয়, তাই করছি।
শুনে বললেন, তোরাতো আমাদের কথা শুনবি না। তোরা বন্ধু-বান্ধবদের কথা শুনিস।
তারপর যেটা বললেন, সেটা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বললেন, আমার ছেলে দেশের জন্য মরে যাকÑ আমার কোনো আপত্তি নাই, আফসোসও নেই। কিন্তু সে আনরিকোগনাইজড অবস্থায় রাস্তাঘাটে মরে পড়ে থাকবেÑ সেটা আমি চাই না। ওকে তোরা বোঝা। ওকে কোনো ট্রেনিং ক্যাম্পের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নিতে বল এবং তারপর যুদ্ধ করুক।
আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি কথা বলব। এরপর বদিকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। শুনে বদি মুচকি মুচকি হাসল। হ্যাঁ না কিছুই বলল না। কিন্তু ট্রেনিং ক্যাম্পে সে যাবেই না।
জুলাইয়ের ৩য় সপ্তাহ হবে। বদিসহ ঢাকা আসলাম। তিন দিন থাকব। ধানমন্ডিতে ছিলাম। কথা ছিল যাওয়ার দিন বদি ওখানে আসবে। নির্ধারিত দিনে বদি এসে বলল, ‘তুমি বাইরে আস। তোমার সঙ্গে কথা আছে।’
ধানমন্ডি-৪ হতে আমরা হাঁটতে হাঁটতে ধানমন্ডি-৭ এ এলাম, সেখানে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একটা অফিস ছিল। দেখলাম একটা বেঞ্চিতে স্বপন (কামরুল হক স্বপন, বীর বিক্রম) বসে আছে। স্বপনের সঙ্গে আমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যদিও সে এক বছরের সিনিয়র ছিল। ও থাকত মালিবাগে। বদি বলল, স্বপনকে কংগ্রাচুলেট কর।
জানতে চাইলাম, কেন?
ওরা একটি পাওয়ার স্টেশন বেøা আপ করেছে। গুলি প্রায় ওর কাঁধের কাছ দিয়ে পাস করে গেছে। বলে শার্ট নামিয়ে দেখাল। দেখলাম ব্যান্ডেজ করা। তারপর বলল, আমি যেতে পারব না। তুমি চলে যাও।
বললাম, তুমিতো আমাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে আমার সঙ্গে ফিরে যাবে।
তখন সে বলল, আমি স্বপনদের সঙ্গে জয়েন করছি। এখানে অস্ত্রপাতির কোনো সমস্যা নাই। প্রচুর আর্মস ও অ্যামিউনিশনস আছে। বদি থেকে গেল। বদির সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা ছিল। সম্ভবত জুলাই ২৮/২৯ তারিখ হবে। আমার বন্ধু আলিমকে সঙ্গে নিয়ে জাওয়ার (কিশোরগঞ্জ) ফিরে গেলাম। তারপর আমার মা ও বোনদের নিয়ে মেঘালয়ে বাবার কাছে পৌঁছে দিয়ে আমি ও আলিম তুরাতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য ঢুকে পড়লাম। এখানে উল্লেখ করব, আমার বাবা সে সময় কিশোরগঞ্জের এসডিপিও ছিলেন। তিনি এপ্রিল মাসেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং বর্ডার ক্রস করে মেঘালয় চলে যান। কাজেই আমার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল মা ও বোনদের বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই বদি এত দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হতে পেরেছিলÑ এর মূলে ছিল ওর বেপরোয়া ভাব ও দুর্দান্ত সাহস। প্রাণের ভয় না থাকলে সবকিছুই সম্ভব। দেশের সেই পরিস্থিতিতে শুধু বদি নয়, অনেকেরই প্রাণের ভয় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বদি যে দুঃসাহসিক অপারেশনগুলো করেছিল তাতে সহজেই অনুমেয় যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অসীম সাহসিকতার কারণেই তার পক্ষে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ আয়ত্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
নিয়তির পরিহাসের কথা দিয়ে আমার স্মৃতিচারণ শেষ করছি। আমরা জাওয়ার, তাড়াইল এবং আশপাশের এলাকায় ছোটখাটো অপারেশনে সম্পৃক্ত থাকলেও সেগুলো ঝুকিঁপূর্ণ ছিল। বদির দলে তার আপন মামা ছিল, বন্ধু মনু ছিল। কিন্তু কেন জানি না বদি আমাকে বারবার প্রতিজ্ঞা করাত যে, যদি সে আহত হলে আমি যেন তাকে হত্যা করি। কেননা সে ওদের অত্যাচার সহ্য করতে পারবে না। বদির পরিণতি নিয়ে যখন ভাবি, অনুধাবন করিÑ নিয়তির অমোঘ বিধান কেউ খÐাতে পারে না। বদিও পারেনি। পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম নির্যাতন শেষে তাকে হত্যা করে। যেই বিষয়টি সে মনেপ্রাণে চায়নি, সেটিই ছিল তার নিয়তিতে। বন্ধু শহীদ বদিউল আলম, বীর বিক্রমের একাত্তরতম জন্মবার্ষিকীতে সমগ্র বাঙালি জাতির সঙ্গে সশ্রদ্ধচিত্তে তাকে স্মরণ করছি।

 শহীদ বদিউল আলমের বন্ধু ও সহযোদ্ধা (কিশোরগঞ্জ)
       অনুলিখন : রুবিনা হোসেন




Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: