দাদুর চোখে মুক্তিযুদ্ধ

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

প্রজাপতির ডানা

বছর ঘুরে আবার এলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। নীতুর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও শেষ। এখন চলছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি।

2019-12-14T00:00:00+00:00
2019-12-14T00:00:00+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রজাপতির ডানা
দাদুর চোখে মুক্তিযুদ্ধ
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম 
বছর ঘুরে আবার এলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। নীতুর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও শেষ। এখন চলছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি। প্রতিবছরই স্কুলে বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। নীতু এবারই প্রথম বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে একটি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করবে। সেটাও আবার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা মঞ্চনাটকে। এই নাটকে সে একজন মুক্তিযোদ্ধার ছোট্ট মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করবে। স্কুলে প্রতিদিন চলছে নাটকের রিহার্সেল। দুজন টিচার নাটকের নির্দেশনা দিচ্ছেন। নাটকের স্ক্রিপ্ট সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও নাটকের চরিত্রের ভেতরে অনেকেই ঢুকতে পারছে না। বিশেষ করে নীতু তো মোটেও পারছে না। বারবার চেষ্টা করে দুজন টিচারই বেশ বিরক্ত হয়ে গেছেন। তাই সবাইকে বাসায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নাটক ও সিনেমা দেখার পরামর্শ দিলেন।
নীতু বাসায় ফিরে কম্পিউটারে মুক্তিযুদ্ধের নাটক দেখতে বসে। কিছু সময় পরেই ওর দাদু এসে পাশে বসেন। তিনিও নীতুর সাথে নাটক দেখতে থাকেন। নাটক শেষ হওয়ার পর নীতু লক্ষ করে তার দাদু চোখে পানি। সে তার ছোট্ট দুহাত দিয়ে দাদুর চোখের পানি মুছে দিয়ে কান্নার কারণ জানতে চায়। তখন দাদু বলেন, নাটক দেখে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল তার। নীতু তার দাদুর কাছে বায়না ধরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে। তখন দাদু বলেন, ঠিক আছে দিদিভাই। তবে আমি যা বলছি, সেটা নিছক গল্প নয়, আমার চোখে দেখা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব সত্য ঘটনা। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর বাঙালিরা ভেবেছিল, ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবার মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাস্তবে দেখে গেল ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও বাঙালিরা সেই আগের মতোই পরাধীন হয়ে আছে। ব্রিটিশদের মতোই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিরীহ বাঙালির ওপর শোষণ, অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন অব্যাহত রাখে। এমনকি আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা পরিবর্তন করে উর্দু করতে চেয়েছিল। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে আমরা আমাদের মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠা করি। ভাষা আন্দোলনের সময়ই বাঙালি পায় একজন মহান নেতা, যার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। নীতু তখন উৎফুল্ল হয়ে বলে ওঠে, তিনি কি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? দাদু বলেন, হ্যাঁ দিদিভাই। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, যাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় নতুন একটি দেশ, আমাদের বাংলাদেশ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ান। তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ে তর্জনী উঁচিয়ে তোলেন। তাদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ক্রমেই তাঁর জনপ্রিয়তা সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর ডাকে প্রতিটি আন্দোলনে বাঙালিরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন দল বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা দিতে রাজি হয়নি। তারা নানাভাবে টালবাহানা করে কালক্ষেপণ করতে থাকে এবং বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের চক্রান্ত বুঝতে পেরে একাত্তরের ৭ই মার্চে দেন এক ঐতিহাসিক ভাষণ। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে মানে বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তিনি লক্ষ জনতার সামনে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ নীতু তখন অনেকটাই উত্তেজনা নিয়ে বলে ওঠে, হ্যাঁ দাদু, আমিও টিভিতে এই ভাষণ শুনেছি। আমাদের নাটকেও এই ভাষণের কিছু অংশ আছে। তখন দাদু আবার বলতে লাগলেন, সেই ভাষণের পরেই বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। সারা দেশে আন্দোলনের একটা জোয়ার উঠতে থাকে। পরিস্থিতি যখন প্রতিক‚লে, তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২৫ মার্চের কালরাতে নিরীহ বাঙালির ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেই সাথে আমাদের নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। তবে গ্রেফতারের আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখে ফ্যাক্স করে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই ঘোষণাপত্র রেডিওতে পাঠ করে সারা দেশবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রাম, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। দেশের সর্বস্তরের জনতা দলে দলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। ওদিকে পাকিস্তানি বাহিনী হিংস্র হায়েনার মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্বিচারে নিরীহ বাঙালি হত্যা করতে থাকে। শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধ, কেউ এদের থেকে রেহাই পায়নি। নারীরাও এদের কাছে নিরাপদ ছিল না। আমাদের দেশের কিছু বিপথগামী মানুষ, যারা রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে দল গঠন করে ওই হানাদারদের সাথে হাত মিলিয়ে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। ওদের সহযোগিতায় পাকি হানাদাররা সারা দেশে নারকীয় ধ্বংসলীলা চালায়। তাদের ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে দেশের নিরীহ মানুষ রাতের আঁধারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে থাকে। আর এই সুযোগে রাজাকার, আলবদর, আলশামসের দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট চালায়।
ওদিকে আমাদের মুক্তিবাহিনী কিন্তু থেমে থাকেনি। তারাও পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রথমদিকে সারা দেশে ওদের ঘাঁটিগুলোতে গেরিলা হামলা চালায়। একপর্যায়ে সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয় করে। একপর্যায়ে কোণঠাসা হতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ত্রিশ লাখ শহীদের প্রাণ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অবশেষে বাংলার পুব আকাশে ওঠে বিজয়ের রক্তিম সূর্য। ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালির চ‚ড়ান্ত বিজয় আসে।
নীতু তখন দাদুকে প্রশ্ন করে, তুমি কি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে?
তখন বলেন, হ্যাঁ আমিও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম।
নীতু তখন গর্বে খুশি হয়ে দাদুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে থাকে। দাদুও নীতুর কপালে চুমু দেন।




Loading...
Loading...
প্রজাপতির ডানা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: