ভার্চুয়াল কোর্ট যোগাযোগ প্রযুক্তিতে নতুন মাইল ফলক

সৈয়দ নুরুর রহমান

আইন-আদালত

ভার্চুয়াল আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। এর ফলে আরও গতিময়

2020-06-01T15:25:15+00:00
2020-06-01T15:25:15+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আইন-আদালত
ভার্চুয়াল কোর্ট যোগাযোগ প্রযুক্তিতে নতুন মাইল ফলক
সৈয়দ নুরুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২০, ৩:২৫ পিএম   (ভিজিট : ১০১৯)
ভার্চুয়াল আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। এর ফলে আরও গতিময় হয়ে উঠছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। ভার্চুয়াল আদালতের নতুন ধারণা ইতিমধ্যে দেশব্যাপী বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে।
গত ১১ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। ঐতিহাসিক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বিচারাঙ্গনও চলে আসে প্রথাগত বিচার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থাপনায়।

ইন্টারনেট কেন্দ্রিক ভার্চুয়াল জগত প্রতিনিয়ত আমাদের প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এই জগতের কল্যাণে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে নিমিষেই। এক সময় যা ছিল খুবই অকল্পনীয়। ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার, মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। মুলত আমরা বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল ফোনে যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই ভার্চুয়াল জগতের বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপর। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে নতুন নতুন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে এ করোনাকালে অধিকাংশ টকশো ছিল ভার্চুয়াল টকশো। পারস্পরিক আড্ডাও এ সময় ভার্চুয়াল জগতকে ঘিরেই জমজমাট হয়ে উঠে। তারই সর্বশেষ মাইলফলক সংযোজন হচ্ছে ভার্চুয়াল আদালত।

চিনের উহানের করোনা ভাইরাস যখন বৈশ্বিক মহামারিতে রুপ নেয় তখন আমাদের দেশও নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ২৬ মার্চ থেকে প্রথম দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন।ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে তালমিলিয়ে ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে আদালতগুলোতেও সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হয়। ক্রমেই সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সাধারণ ছুটির মেয়াদ পঞ্চম দফায় ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেশের বিচার ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসে। বিচার প্রত্যাশী মানুষের বিচার প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে আদালত বন্ধ থাকায় দেশের বিচারপতি, শীর্ষস্থানীয় অনেক আইনজীবী ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য সোচ্চার হয়ে উঠেন । পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘ফুল কোর্ট সভা’ থেকে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।

পরে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে ভার্চুয়াল আদালত চালু করতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে এগিয়ে আসে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৬ মে আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০-এর খসড়ায় নীতিগত ও চুড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এরপর রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে স্বশরীরে আদালতে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে “আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ- ২০২০” নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন । রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০’ নামে ভার্চুয়াল আদালতের গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালতকে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই অধ্যাদেশ জারি পর সুপ্রিম কোর্টের বিচার কাজ পরিচালনার জন্য ভার্চুয়াল ব্যবস্থা হাইকোর্ট রুলস-এ অন্তর্ভূক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভার্চুয়াল আদালতের গেজেট প্রকাশ হওয়ার পরদিন ১০ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে ফুলকোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভা শেষে ওইদিনই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবরের স্বাক্ষরে আদালতের জন্য ২১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ এবং আইনজীবীদের জন্য ‘ভার্চুয়াল কোর্টরুম ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করা হয়। এছাড়া হাইকোর্টে তিনটি ভার্চুয়াল বেঞ্চও আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের বেঞ্চ গঠন করা হয়।

করোনাভাইরাস কেন্দ্রিক সাধারণ ছুটি ও অবকাশকালীন ছুটি বা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত, হাইকোর্ট ও সারাদেশের অধস্তন আদালতগুলো ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে পরিচালনার জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট অধস্তন আদালতগুলোকে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে শুধুমাত্র জামিন শুনানির অনুমতি প্রদান করে।
নির্দেশনায় বলা হয়, ভার্চুয়াল আদালত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। প্রত্যেক আদালত একটি ই-মেইল আইডি এবং মোবাইল ফোন নাম্বারের মাধ্যমে চিহ্নিত হবে। আইনজীবীরাও একইভাবে চিহ্নিত হবেন। জামিন আবেদন এবং শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনলাইনে দাখিল করতে হবে। এই শুনানি এবং আদালতের কাজে অ্যাপ ব্যবহার করা হবে। আদালতের কাজ পরিচালনা করা হবে আদালতের প্রচলিত অফিস সময়ের মধ্যে। আর ভার্চুয়াল উপস্থিতি শারীরিক উপস্থিতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

এরপর গত ১১ মে দেশের ইতিহাসে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিন হাইকোর্টে বেশকিছু আবেদন দাখিল করা হয়। ঐদিনই কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ মোঃ আতাবুল্লাহর ভার্চুয়াল আদালত থেকে ১ জন আসামির জামিন মঞ্জুরের আদেশ হয়। পরদিন ১২ মে সারাদেশের অধস্তন ভার্চুয়াল আদালতগুলো থেকে ১৪৪ জন, ১৩ মে ১০১৩ জন, ১৪ মে ১৮২১ জন, ১৭ মে ৩৪৪৭ জন, ১৮ মে ৩৬৩৩ জন, ১৯ মে ৪০৬৩ জন এবং ২০ মে ৪৪৮৪ জন, ঈদের ছুটির পর ২৭ মে ৮৭৬ এবং ২৮ মে ১৪৭৭ জনের জামিন হয়েছে।

সারাদেশে ভার্চুয়াল আদালতে ১১ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১০ কার্যদিবসে ৩৩ হাজার ২৮৭টি মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৯৩৮ জনের জামিন মঞ্জুর হয়েছে। এই সময়ে ভার্চুয়াল হাইকোর্ট থেকেও বেশ কিছু জামিন আদেশ হয়েছে। আর এরই মধ্যে জামিন পেয়েছেন দুই শতাধিক শিশু। ৩০ মে’র পর সরকার সাধারণ ছুটি না বাড়ালেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ‘ফুল কোর্ট সভা’ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত  ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

এই ভার্চুয়াল আদালতের জন্য সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের অধীনে ইউএনডিপি প্রশিক্ষণ, অনলাইন টিউটোরিয়াল ও সফটওয়্যারের কাজ করছে। উচ্চ আদালত প্রাথমিকভাবে অধস্তন আদালতের ৮৩ জন বিচারককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এই প্রশিক্ষণে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকেও সংযুক্ত করা হয়েছে। বিচারকদের এই প্রশিক্ষণ ধারাবাহিকভাবে চলার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ আইনটিকে যুগান্তকারী এবং এ আইন বাংলাদেশে আর একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে বলে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করার জন্য আগে থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনা ছিলো। ই-জুডিশিয়ারি করার জন্য একটি পরিকল্পনা একনেকে আছে। একনেকে পাস হলেই ওটার কাজ শুরু হবে।

তিনি বলেন, করোনায় আদালত বন্ধ থাকায় দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে মামলা জট। তাই ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে কিছুটা হলেও মামলা জট কমানো এবং বিচার প্রার্থীদের বিচার পাইয়ে দেয়ার জন্য এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে জামিন শুনানি এবং দেওয়ানি আদালত চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর উচ্চ আদালতও ভার্চুয়াল বেঞ্চের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ফৌজদারি বিচার চালাতে হলে সাক্ষ্য আইনের কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। সেই আইন সংশোধনের উদ্যোগও আমরা নিচ্ছি।

এদিকে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা শুরু করার পরপরই আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তরুণ আইনজীবীদের বেশিরভাগই এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানালেও প্রবীণ আইনজীবীদের অধিকাংশ এ প্রক্রিয়ায় বিরুপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বয়সজনিত কারণে প্রযুক্তিগত বিদ্যায় তাদের জ্ঞানের অভাব, জানা থাকলেও অনভ্যস্ততা, তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ইত্যাদি কারণে মূলত প্রবীণ আইনজীবীরাই এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পড়েন নানামুখি বিড়ম্বনায়। এনিয়ে অভিযোগেরও অন্ত ছিল না তাদের। এ কারণে ভার্চুয়াল আদালত শুরুর প্রথম দু'দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘ভার্চুয়াল আদালত’ প্রত্যাখ্যান করে বেশ কয়েকটি আইনজীবী সমিতি। কোথাওবা বিক্ষুব্ধ হয়ে বিবৃতি দিয়েছেন আইনজীবীরা। দেশের বিভিন্ন জেলা আদালত প্রাঙ্গণে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, জামালপুরসহ আরও কিছু জেলায় বিক্ষোভ করেছেন অনেক আইনজীবী। প্রথমে বর্জনের ঘোষনা দিয়ে পরে পিছু হটে কুমিল্লা, গোপালগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলা আইনজীবী সমিতি। এজন্য সভা করে  তারা প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণের জন্য কেউ ১৫ দিন, কেউ এক মাস সময় চেয়েছেন। আইনজীবীদের অভিযোগ, পূর্ব প্রস্তুতি, লজিস্টিক সাপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় ডিজিটাল এই পদ্ধতিতে বিচারকার্যে অংশ নিতে পারছেন না তারা। প্রথমত ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানী করার জন্য একজন আইনজীবীর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলফোন সেট বা ল্যাপটপ বা কম্পিউটার থাকতে হবে। আবার নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, মেইল আইডি, মামলার ডকুমেন্টগুলোর সফট কপি করতে স্ক্যানারও লাগবে। বাড়িতে  বিদ্যুৎ সংযোগ থাকাও লাগবে। দেশের সিংহভাগ আইনজীবীর এই মুহূর্তে এসব সরঞ্জাম কেনার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই বলে বক্তৃতা বিবৃতি দেয় তারা।
দেশের অধিকাংশ আইনজীবী সমিতির অভিমত ছিল, এটি সরকারের খুব ভালো ডিসিশন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব না। এ জন্য আইনজীবীদের সময় দিতে হবে। এ আইন বাস্তবায়নের জন্যে বিচারক, বেঞ্চ সহকারী, আইনজীবী, পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেককেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। আদালতে বিচারকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় দ্রুত লজিস্টিক সাপোর্ট নিতে পারছে কিন্তু একজন আইনজীবীকে এগুলো করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। প্রবীণ আইনজীবীদের অভিমত ছিল, আমরা বাটনওয়ালা মোবাইল ফোন ঠিকমতো চালাতে পারি না। আর স্মার্টফোন, ওয়েবক্যাম, স্ক্যানার-এগুলো কীভাবে চালাবো। প্রশিক্ষণ পেলে অন্তত জুনিয়রদের দিয়েও কাজটা চালাতে পারতাম।

তবে প্রথম দুইদিনের তুলনায় তৃতীয় দিনে আইনজীবীদের এই ক্ষোভ খানিকটা প্রশমিত হতে দেখা যায়। বিক্ষোভ ছেড়ে জীবিকার তাগিদেই সবাই নিজে বা জুনিয়র বা সহকারীদের দিয়ে অনলাইন আদালতের প্রক্রিয়ার সাথে অভ্যস্থ হওয়ার  চেষ্টা করেন। শুরুর সময় বিভিন্ন জেলার আদালত সংলগ্ন কম্পিউটার দোকান, সাইবার ক্যাফেগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠে। আইনজীবীদের একাউন্ট খোলা, ইমেইল আইডি খোলা, মামলার কাগজপত্র স্ক্যান করে নিদিষ্ট অ্যাপে আপলোড করাসহ নানাবিধ কাজে দোকানগুলো ছিল সরগরম। জীবিকার তাগিদে পাবলিক প্লেসে এগুলো  করতে হয়েছে আইনজীবীদের।
মুলত ভার্চুয়াল আদালতের নিয়মটি খুব সহজ এবং বোধগম্য বটে। শুরুতে আইনজীবীরা এতে খুব একটা অভ্যস্ত না বলে কেউ কেউ একটু অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন। তবে  দ্রুততম সময়ের  মধ্যে অনেক আইনজীবী এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন।  তরুণ আইনজীবীরা একপর্যায়ে নিজেদের স্মার্ট ফোনেই যাবতীয় কাজ এবং মামলার শুনানী করেছেন।

প্রত্যেক আইনজীবীকে মাইকোর্ট বা আমার আদালত অ্যাপে নিজের নিবন্ধন বা রেজিষ্টেশন করতে হয়েছে। শুরুতে আইনজীবীদের নিজ নিজ প্রোফাইল ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে স্বাক্ষর আর জাতীয় পরিচয়পত্র আপলোড করতে বিড়ম্বনা দেখা দেয়। ফাইলগুলো হালকা করে অর্থাৎ  ফাইলের সাইজ মেগাবাইট থেকে কিলোবাইটে রুপান্তর করে আপলোড করতে হয়েছে। মামলা শুনানী করার জন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার ডেস্কটপ কিংবা মোবাইল ফোনে আদালতের চাহিদা অনুযায়ী জুম, গুগল মিট আর মাইক্রোসফট টিম সেটআপ দিতে হয়েছে।

যদিও এখন পর্যন্ত পোর্টালটি স্বয়ংসম্পূর্ণ না। পরীক্ষামুলক সংস্করণ। মামলা ই-ফাইলিং করতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে আইনজীবীদের। প্রথমদিকে আমার আদালত সিস্টেমে দায়রা জজ আদালতের কোন মামলা ফাইলিং করা যায়নি। পরবর্তীতে " তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল শুনানীর মাধ্যমে নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ে অনুসরণীয় বিশেষ প্রাকটিস নির্দেশনা" অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রদত্ত ই-মেইল আইডিতে ই-ফাইলিং করতে হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। অবশ্য আমার আদালত সিস্টেমে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্টেট আদালতের মামলাগুলো ই-ফাইলিং-এ সমস্যা হয়নি। বিপুল সংখ্যক জামিনের দরখাস্ত নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এলাকাভেদে একাধিক ভার্চুয়াল আদালত গঠন করেন। অনেক জায়গায় ভার্চুয়াল শুনানীতে ভার্চুয়াল আদালতের চাহিদা অনুযায়ী জুম, গুগল মিট আর মাইক্রোসফট টিম ব্যবহার হয়নি। বিভিন্ন স্থানে  প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কিংবা ইন্টারনেট সমস্যার কারনে  শুনানী ইমোতে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা শুনানীর সিরিয়াল নিয়ে শুরু থেকে জেলাগুলোতে  তুঘলকি কান্ডকারখানা শুরু হয়। আদালত অঙ্গনের দুষ্টচক্রের ফায়দা হাসিলের নতুন মওকা নিয়ে আমাদের তরুণ আইনজীবী বন্ধুদের অন্তহীন অভিযোগ, অসন্তোষ দেখা দেয়। অনেকেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলেন।

নানা প্রতিকুলতা ডিঙ্গিয়ে প্রযুক্তির নতুন ধারণার সাথে আইনজীবীরা সম্পৃক্ত হতে পেরে আনন্দিত। তবে প্রতিদিন আদালতপাড়ায় গিয়ে  জামিন আবেদন, ওকালতনামা, মামলার প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র, বেইলবন্ড, রিলিজ অর্ডার, জিম্মাদারের পরিচয়পত্র স্ক্যান করা,  প্রতিনিয়ত কারাগার থেকে ওকালতনামা সংগ্রহ, দরখাস্ত, জামিননামা কিনে প্রস্তুত করার যাবতীয় ছুটোছুটির কাজগুলো করতে হয়েছে জীবনের ঝুকি নিয়ে। এক্ষেত্রে আইনজীবী কিংবা আইনজীবী সহকারীদের ঘর থেকে বের হয়েই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

এরমাঝেও আইনজীবীদের নিরন্তর প্রত্যাশা, এ অদ্ভুত আধার কেটে যাক। অচিরেই যেন সেই নতুন প্রভাতের আলো ছড়িয়ে পড়ে, আবারো যেন চিরচেনা আদালত অঙ্গন সরব হয়ে উঠে।

লেখক: কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি ও কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক


Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: