প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে মোটামুটি বরাদ্দ থাকলেও সংশোধনের সময় বড় ধরনের হ্রাস করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্যান্য খাতের বরাদ্দ ছুরি দিয়ে কাটলেও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কোদাল দিয়ে কাটা হয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী।
বুধবার (১২ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সিপিডি বাজেট সংলাপ ২০২৪’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ও রাশেদা কে চৌধূরী, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, শ্রমিকনেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ প্রমুখ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সঞ্চালনায় এতে মূল পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। প্রবন্ধে তিনি দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের ঘাটতির কারণে আমদানি হ্রাস এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে ধীরগতির কারণ চিহ্নিত করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার ও এমসিসিআইয়ের ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান আদিব এইচ খান প্রমুখ।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সবশেষ এডিপির রিভিশনে দেখেছি ১৬ হাজার কোটি টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকাই শিক্ষায়, আর ৪ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যে। এই হচ্ছে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নমুনা। এডিবি সংশোধনের সময় শিক্ষাকে বেশি কর্তন করা হয়। সক্ষমতার অভাবে বরাদ্দ করা অর্থকে বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, উপবৃত্তির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি কোনদিন ভাবা হয়নি। নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বেড়েছে শিক্ষা উপকরণের দাম। কিন্তু গত কয়েক বছর আগে যে উপবৃত্তি দেওয়া হতো, এখনো সেই উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, বাড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই। কেন বাড়ছে না, বাজেটে এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
শিক্ষা গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষায় গবেষণা নেই। এর ফলে শিক্ষার ব্যয় ব্যহত হচ্ছে। নতুন শিক্ষকদের জন্য বেতন বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য কিছুই করা হয়নি। আবার সেখানে যাওয়ার জন্য গবেষণা নেই, যা আছে তা খুবই হতাশাজনক। কিন্তু সেটাও পূরণের কোনো লক্ষণ নেই। সারসার্জ (সম্পদ কর) দিয়ে যমুনা সেতু করেছিলাম, প্রয়োজনে শিক্ষাকে আমরা সারচার্জ দিয়ে এগিয়ে নিতে চাই।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অতিসাধারণ বাজেট বলে অভিহিত করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, একটি অতিসাধারণ বাজেট, যা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে শিক্ষাকে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ উল্লেখ করে আগামী দিনের সুনাগরিক গড়তে বিনিয়োগের কথা বলেছিলেন। গত কয়েক বছরে আমরা দেখছি বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা হলেও স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই। বাজেটে শিক্ষায় অর্থ দেওয়াকে বরাদ্দ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিনিয়োগ হিসেবে চিন্তা করা হয় না। অথচ কত আগে বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন!
সেমিনারে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী, বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এম এ মান্নান বলেন, মন্ত্রী থাকার সময় তার হাত দিয়ে এমন প্রকল্প একনেকে গেছে, যেগুলোর সঙ্গে তিনি মনেপ্রাণে একমত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা বাস করি ভূতলে (মাটিতে), আর বিনিয়োগ করি পাতালে। এ ধরনের অনেক প্রকল্প বাংলাদেশে আছে।’
এম এ মান্নান এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়- সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। তবে অনুষ্ঠানে তিনি নিজের বক্তব্যে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আমি দলে ও সংসদে আছি। প্রতিনিধিত্ব করছি সাধারণ মানুষ ও গ্রামীণ এলাকার। আমরা গ্রামে বিদ্যুৎ পেয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিক পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী এসব দিয়েছেন।’
এম এ মান্নান বলেন, ‘বাজেটে কোথায় ব্যয় করছি, সেখান থেকে আমরা কী পাচ্ছি- এসব বিচার করা দরকার। আদৌ কোনো ফল পাচ্ছি কি না, তা-ও দেখা দরকার।’ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো কোনো জায়গায় আমার ভিন্নমত অবশ্যই আছে।’
‘মূল্যস্ফীতি আমাদের কষ্ট দেয়’ স্বীকার করে এম এ মান্নান বলেন, ‘সাধারণ জ্ঞানে বলছি, আমাদের মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ক্রিপিং (যা ধীরে ধীরে বাড়ে)। এটা যদি দ্রুতগতির হতো বা বল্গাহীন হতো, তাহলে ছোবল কত বেশি হতো, তা অচিন্তনীয়।’
সাবেক এই পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির একটা বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। একটাকে ছেড়ে আরেকটা করা যাবে না। প্রবৃদ্ধি না করলে আমাদের জীবনযাত্রা নিচে নেমে আসবে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে যাবে, কিন্তু আমাদের সবকিছু নেমে আসবে। এই ঝুঁকি আমাদের নিতে হবে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গেছে।’
উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে : ড. মসিউর রহমান
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিনিময় হারের উদারীকরণ ভালো একটি পদক্ষেপ। আমরা এখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে চাই। পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যের ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমরা আরএমজিতে (তৈরি পোশাকশিল্প) ফোকাস দেবো।
ড. মসিউর রহমান বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং ঋণগ্রহণের উপযুক্ততা বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া ব্যাংকটির সামগ্রিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে যখন সরকার ঋণ নেয়, সে ঋণের ওপর আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে কিছু মুনাফা পান। ঋণের টাকা বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় করা হয়। সেখান থেকেও সমাজে সুবিধা বিস্তার হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, করপোরেট যে করহার, তাতে অংশীদাররা সন্তুষ্ট। অগ্রিম কর পরে সমন্বয় করে পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে। কোন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনবে, আর কোন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি সুবিধা দেবে, এটা এনবিআরের পলিসি। তিনি আরও বলেন, বেকারত্ব দূর করতে আরও সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। বেসরকারি খাতকেও এজন্য এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
সুশাসন নিশ্চিত হলে ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হবে : সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মনে করেন, দেশে সুশাসন (গভর্নেন্স) ঠিক হলে ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক জায়গায় লিকেজ (ত্রুটি) আছে। এক্সপেনডিচারে (ব্যয়ে) যেমন লিকেজ আছে, তেমনি ইনকামের (আয়ের) ক্ষেত্রেও লিকেজ আছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এতে অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদরা সুশাসন নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আমার রাজনৈতিক জীবনে বর্তমান সময়ের মত এতটা অর্থনীতিতে দুর্বলতর পজিশন কখনো দেখিনি।
১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, চুরি-ডাকাতি-মার্ডার করে আয় করা টাকা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না। তারা কি চুরির টাকা দেশের উন্নয়নে আনবে? আমি যদি ট্যাক্স না দিয়ে পরের বছর ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পাই, তাহলে আমি কেন টেক্স দেব। এই বোকামি কেন করব?
আনিসুল ইসলাম বলেন, আমরা শুনছি কানাডা, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে কারো কারো বাড়ি আছে, সেই লিস্ট করা হয়। তাদের চিহ্নিত করে ধরা হচ্ছে না কেন?
তিনি বলেন, ব্যাংকখাতে ২০১৮ সালে ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছিল খেলাপি ঋণ। সেটি এখন বেড়ে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আর সব হিসাব করলে সেটি সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। এই টাকা উদ্ধারে তেমন কিছুই করা হচ্ছে না, অথচ যারা পরিশোধ করছে, পরিশোধ করার চেষ্টা করছে তাদের ধরা হচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডআই