হাসিনা সরকার গত সাড়ে ১৫ বছরে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পেই বেশি ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধের চাপে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এদিকে ক্ষমতায় এসে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই শুরু করেছে তারা। এর ফলে অনেক প্রকল্পেই কমে গেছে অর্থছাড়। এদিকে নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক চিন্তাভাবনা চলছে। এতে নতুন প্রকল্প অনুমোদনও কমে গেছে। এ কারণে নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিতেও ধস নেমেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সবশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বরে) বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ১৫৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। অথচ এসময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৭১ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে একই সময়ে ১৩৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল। এ হিসাবে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে শুধু আসল পরিশোধই বেড়েছে ২৯ কোটি ডলার। বিপরীতে চলতি অর্থবছরে কমে গেছে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ৫২ কোটি ২৬ লাখ ডলার। এর আগের বছর একই সময়ে প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৫৮৫ কোটি ডলার। ইআরডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অর্থবছরে নির্বাচনের আগে অনেক প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক ঋণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এ কারণে অনেক প্রকল্পে ঋণ চুক্তি হয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতিও বেশি ছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরে নতুন সরকার আসার পর অনেক যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ফলে ঋণচুক্তি অনেক কম হচ্ছে। তবে সামনে বাড়বে বলে আশা তাদের।
তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বহুপক্ষীয় এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ ও বাজেট সহায়তার প্রাথমিক আশ্বাস দিয়েছে। নভেম্বরেই বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ঋণ চুক্তি হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তুত ও কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড় কমেছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী।
তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় অর্থছাড় হয়ে থাকে কাজের অগ্রগতির ওপর। যতটুকু কাজ হয়েছে সেটির ওপরই উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থছাড় করে থাকে। যেহেতু এ দুই মাস আন্দোলনের কারণে কাজ হয়নি, তাই ঋণের অর্থছাড়ও কম হয়েছে। কাজের অগ্রগতি বাড়লে অর্থছাড়ও বাড়বে। এটি সাময়িক।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে পদ্মা রেল সংযোগ, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আলাদা চাপ তৈরি হয়েছে। অথচ মেট্রোরেল বাদে পদ্মা রেল সংযোগ ও কর্ণফুলী টানেল থেকে তেমন রিটার্ন আসছে না। যা আয় হচ্ছে তার চেয়ে বেশি মেইনটেন্যান্স খরচ হয়ে যাচ্ছে। সরকারকে নিজের তহবিল থেকে এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ি অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৩৩৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬৮ কোটি ডলার বেশি। এর আগে কোনো অর্থবছরে সরকারকে এত ঋণ পরিশোধ করতে হয়নি। সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৬৭ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করেছিল। মূলত সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৪১ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে এ ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।