ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৫ জুলাই ২০২২ ২১ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার মঙ্গলবার ৫ জুলাই ২০২২

ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেল ময়মনসিংহ
জাহানুল করিম শিমুল,ময়মনসিংহ ব্যুরো
প্রকাশ: সোমবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৯, ২:৪৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 1648

‘হাওর-বাওড়-মইষের শিং, এই তিনে ময়মনসিং’-প্রবাদ- প্রবচনে এভাবেই পরিচয় করানো হতো ময়মনসিংহ বিভাগকে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি ময়মনসিংহ। ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্যের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক জীবন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, জীবিকা ও সংস্কৃতি বৈচিত্র্যপূর্ণ। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সূতিকাগার হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগকে গড়ে তুলতে স্থানীয় রাজা-রাজড়া ও জমিদারদের বিশাল অবদান ছিল। ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এ নদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই শিল্পার্চায জয়নুল আবেদিন বহু ছবি একেঁছিলেন। এখানকার বহু স্থাপনায়

প্রাচীন নির্মাণশৈলীর ছোঁয়া রয়েছে। আছে কালের সাক্ষী জমিদারবাড়ী। সে রকমেই কিছু জমিদারবাড়ীর খোঁজ-যা একাধারে দৃস্টিনন্দন ও ঐতিহ্যের বাহক। ১৮৭৯ সালে জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধূরী ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে আট বিঘা জমির দেয়াল বেষ্টিত স্থানে একটি সুদৃশ্য ভবন নির্মাণ করেন। ময়মনসিংহ শহরের প্রান কেন্দ্রে এই ভবনটি অবস্থিত।

ভারতের ব্রিটিশ শাসক সপ্তম এডওয়ার্ড ও তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রার তৈলচিত্র স্থাপন করেন ভবনটিতে এবং ভবনটির নামকরণ করেন আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল। কারো কারো মতে, তৎকালীন ময়মনসিংহের জেলা কালেক্টর এন.এস. আলেকজান্দ্রা-এর নামে ভবনটি আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল নামে নির্মিত হয়। এ ভবন নির্মাণের পেছনে মহারাজার সৌন্দর্যবোধ ও উন্নত রুচির প্রেরণা কাজ করেছে। স্থান নির্বাচনও তাঁর দৃষ্টি  ছিল নান্দনিক। মনোরম পরিবেশের বাস্তব নিদর্শন এ সময়ের দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

বাড়ির চারপাশ ছিল বাগান দ্বারা সুসজ্জিত বিধায় একে ব্যয়বহুল উদ্যানও বলা হত। বিভিন্ন দুর্লভ গাছ, লতাগুল্ম, কৃত্রিম হ্রদ, টিলা, উপত্যকা, ঝরনা, বিভিন্ন পশু-পাখি, সরীসৃপ পালনের ঘর ইত্যাদি মিলিয়ে অসাধারন ও হৃদয়হরণকারী ছিল বাড়ির সৌর্ন্দয। মূল ভবনটি লোহা, কাঠ, টিন এবং বিভিন্ন ধাতব উপদান নির্মিত কাঠের সিঁড়িবিশিষ্ট দ্বিতল ভবন। এই ভবনটিতে এতোটাই লোহা ব্যবহার করা হয়েছে যে স্থানীয় লোকজন ভবনটিকে নামকরন করেন লোহা কুটির। লোহা কুটির নামেই এখনও এই ভবনটি রয়েছে।

ভবনটিতে ঐতিহ্যবাহী হস্ত বা কারু শিল্পকর্মের অসাধারন নিদর্শন ছিল এবং কিছুটা হলেও আজও অবশিষ্ট আছে। দু’পাশে লাগানো আছে দু’টি গ্রিক মূর্তি, যদিও এখন মূর্তি গুলো অযতেœ ভেঙ্গে গেছে। গোটা বাড়িটাই একটা বিশাল স্তম্ভমূলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ব্রহ্মপুত্র নদীর বন্যার হাত থেকে বাড়িটাকে রক্ষা করার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বাড়ির ঢালু ছাদ পুরোটাই ঢেউ ভেলানো লোহার তৈরী। দোতলার সিলিং-এ অভ্র আর চুমকি ব্যবহার করা হয়েছিল বাড়িটাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করার জন্য। তখনকার দিনে জমকালো আর অভিজাত আসবাব দিয়ে সাজানো হয়েছিল এই বাড়িকে। দু’খানা খুব সুন্দর রুপোর এখনও দর্শকদের মুগ্ধ করে। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে মহারাজা সূর্যকান্ত এখানকার বাগানে বাঘ পুষতেন, যে কারনে গোটা বাগান ঢাকা থাকত ইস্পাতের খাঁচায়।

এই বাগানবাড়ি মহারাজের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। অনেক বরেণ্য মানুষই এই ক্যাসেলে রাত কাটিয়েছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মহাত্মা গান্ধি। ১৯২৬ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি এখানে থেকে যান। এছাড়াও ভারতের তৎকালীন ইংরেজ সেনাপতি জর্জ হোয়াইট, ভারতের প্রধান বিচারপতি ক্রোমার প্যাথরাম, ভারতের বড় লাট লর্ড কার্জন, ফ্রান্সিস ম্যালকম, রাশিয়ার যুবরাজ ডিউক মরিস, আয়ারল্যান্ডের লর্ড উইসবোর্ন, স্পেনের ডিউক অব পেনাবেন্ডা, মিশরের যুবরাজ ইউসুফ কামাল পাশা, শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী ভ্রাতৃদ্বয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, স্যার সলিমুল্লাহর মতো মানুষরাও এখানে পা রেখেছেন।

১৯৪৮ সালে এই ভবন ঘিরে তৈরি হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। প্রথমে আলেকজান্ডার ক্যাসেলকে ট্রেনিং কলেজের ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হত। পরে কলেজের ভবন আরও বাড়ালে ক্যাসেলের দোতলায় শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় । তারপর অনেকদিন ধরেই আলেকজান্ডার ক্যাসেল ব্যবহার হচ্ছে কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে। এখন ক্যাসেলের একতলায় আটটি ঘরে প্রায় ১৫ হাজার বই রাখা আছে।    
     
বর্তমানে এই ভবন সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থানে নবনির্মিত কয়েকটি ভবনে পুরুষদের জন্য সরকারি ময়মনসিংহ টির্চাস ট্রেনিং কলেজ চালু রয়েছে। সরজমিনে দেখা যায় যে, আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের প্রবেশ পথে দুটি পাথরের মূর্ত্তি আছে। কিন্তু মূর্ত্তি দুুটিই অযত্নে অবহেলায় ভাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে। একথায় বলা যায় মূর্ত্তি দুটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় আছে।

 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]