কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন যেন অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য। চুরি, ছিনতাই, যাত্রীদের ব্যাগ টানা-হেঁচড়া, মাদক কেনাবেচা ও পতিতাবৃত্তিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা এখানে ঘটে না। সন্ধ্যার পর রেলস্টেশনসহ আশপাশের এলাকা আরও ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করে। কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে চলে মাদক কেনাবেচা। পুলিশের চোখের সামনে এসব অপরাধ ঘটলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে অনেককে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
রেলে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের মূল ভবন ও প্ল্যাটফর্মগুলোর বেশিরভাগ জায়গা ঘিরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক ভাসমান অপরাধী চক্র। বিভিন্ন সময়ে যাত্রী ও পথচারীদের মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে তারা। তবে খুব কমসংখ্যক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন। যারা অভিযোগ করেন তারাও যথাযথ প্রতিকার পান না। গত ২৯ জানুয়ারি রাতে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এসে কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে ভারতীয় এক লেখকের পাসপোর্ট, ডলার ও টাকা খোয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সাধারণত বাস ও লঞ্চ স্টেশনগুলোতে অপরাধীদের আনাগোনা বেশি থাকলেও কমলাপুর যেন সব ধরনের অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য।
শনিবার দুপুরের দিকে সরেজমিন দেখা যায়, কমলাপুর স্টেশনে প্রবেশের সময় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন জামে মসজিদের সামনে ভাসমান মানুষের জটলা। মূল প্রবেশ পথের কাছেই শুয়ে আছে বেশ কয়েকজন ভাসমান নারী-পুরুষ। তাদের পাশেই কয়েকজন নারী ভাত বিক্রি করছেন। এই জটলার পাশে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি করছেন চার-পাঁচজন নারী ও পুরুষ। বিক্রেতাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি। পেশাদার মাদকসেবীদের পাশাপাশি রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের গাঁজা ও ইয়াবা কিনতে দেখা গেছে।
স্টেশনের সামনে এক পান দোকানি বলেন, সন্ধ্যার পর রেলস্টেশন থেকে টিটিপাড়া মেথরপট্টি পর্যন্ত রেললাইন ঘিরে মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়। এখান থেকে খুব সহজেই ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ প্রায় সব ধরনের মাদক পাওয়া যায়। এ ছাড়া রেললাইনের পাশের বস্তিতেও কম টাকায় সহজে চোলাইমদ পাওয়া যায়। এ সময় মূল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে টিকেট কাউন্টারসহ প্ল্যাটফর্মেও দেখা গেছে ভাসমান অপরাধীদের আনাগোনা। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের আশপাশে তারা ঘোরাফেরা করছে। এসব অপরাধীর টার্গেট ট্রেনের যাত্রীরা। তবে বড় টার্গেট হলো নারী ও বয়স্ক পুরুষ যাত্রী।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রেন ছাড়ার সময়ে জানালার পাশে থাকা যাত্রীদের মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিস ছোঁ মেরে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া ট্রেনের ভেতরে ও ছাদেও চলে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সাধারণত স্বল্প আয়ের মানুষ ও টিকেট না পেয়ে ছাদে চড়ে বসেন। অনেক সময়ে ছিনতাইয়ে বাধা দিলে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে তাদের ফেলে দেওয়া হয়। গত বছর তেজগাঁও ও বনানীতে বেশ কয়েকজনকে ছুরিকাঘাত করে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ে স্টেশন জামে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়া মুসল্লি রহিম শেখ বলেন, প্রতিদিনই ১৫-২০ জন মুসল্লির জুতা চুরির ঘটনা ঘটে। নামাজের সময় মসজিদের সামনে ৩০-৪০ জন নারী ও শিশু দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করে। এসব নারী ও তাদের সঙ্গে থাকা পুরুষরাই জুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী চুরি করে।
তিনি বলেন, স্টেশন ঘিরে অনেক অপরাধী চক্র সক্রিয়। তারা শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি, যাত্রী হয়রানি, ছিনতাই ও মাদক বিক্রি করায়। পুলিশের চোখের সামনে এসব অপরাধ ঘটলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না। আবার মাঝেমধ্যে কয়েকজন ধরা পড়লেও তারা ছাড়া পেয়ে একই কাজ শুরু করে।
কমলাপুর স্টেশনের উভয় পাশ দিয়ে মুগদা বিশ্বরোড এলাকায় যাওয়ার পথ। এ পথে চলাচলরত স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রেলস্টেশন ঘিরে বিপুলসংখ্যক ভাসমান লোকের আনাগোনা রয়েছে। কমলাপুর থানার সামনে পাবলিক টয়লেটের পাশে ভাসমানদের আনাগোনা বেশি দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন বয়সের কয়েকশ অপরাধী। এসব অপরাধী চক্র দিনের বেলা স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের বিরক্ত করা ছাড়াও ভিক্ষা চাওয়ার ছলে পথচারীদের জামা-কাপড় টেনে ধরে রাখে। চাহিদামতো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গালাগালি করা ছাড়াও শরীরে ময়লা-আবর্জনা ছুড়ে মারে।
রাজিফা সুলতানা নামে এক আয়কর আইনজীবী বলেন, চেম্বার থেকে সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরার সময় অনেক ঝুঁকি নিয়ে মুগদা যাওয়ার পথচারী সিঁড়িটি পার হতে হয়। স্টেশন ছাড়াও সিঁড়িতে চলাচলরত পথচারীদের মোবাইল ফোন ও ভেনিটি ব্যাগ ছিনিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় ভাসমান ছিনতাইকারীরা। এ ছাড়া রাতে সিঁড়িতে বসে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২৯ জানুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নিতে এসে কমলাপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন ভারতীয় লেখক সমীরণ দত্ত (৬০)। তার ব্যাগ থেকে ডলার, পাসপোর্ট ও টাকা নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করলে কমলাপুর রেলওয়ে থানা পুলিশের তৎপরতায় পাসপোর্ট ও কিছু টাকা ফেরত পান ওই লেখক। ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ জনকে আটক করে রেলওয়ে থানা পুলিশ।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি রকিবুল হোসেন জানান, কমলাপুর স্টেশন ঘিরে থাকা সব ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে অভিযান চালানো হয়। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে সবসময় রেলওয়ে পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ সঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় লেখকের চুরির ঘটনায় ইতোমধ্যে ৫ জনকে আটকসহ খোয়া যাওয়া পাসপোর্ট ও কিছু টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।