
হারিয়ে যাওয়া সুস্বাদু সোনালি মহাশোল মাছের কৃত্রিম প্রজননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির বিপন্ন মহাশোলের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ কৌশল উদ্ভাবনে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে নদ-নদী ও পুকুরেও মিলবে মহাশোল। কম মূল্যেই খেতে পারবে ভোক্তারা। ‘মহাশোল’ বিলুপ্তপ্রায় একটি মাছ। সুস্বাদু এই মাছ এখন দুর্লভ। উচ্চমূল্যেও পাওয়া যায় না। নেত্রকোনার পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ পানি আর সোমেশ^রী ও কংস নদী মহাশোল মাছের আবাসস্থল। জেলেদের কাছ থেকে মহাশোল মাছ সংগ্রহকারী ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা মুহাম্মদ খান জানান, মহাশোল মাছ ধরে দেওয়ার জন্য তিন মাস আগে থেকেই সোমেশ^রী নদীর জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা বিভিন্ন সময় মহাশোল মাছ ধরে স্থানীয় পুকুরে মজুদ করে। এ পর্যন্ত ২৫টি মাছ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে সৃষ্ট খরস্রোতা সোমেশ^রী নদী সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রবেশ করেছে। অপরূপ সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম প্রকৃতির মধ্য দিয়ে বহমান পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ পানি ও খরস্রোতা সোমেশ^রী ও কংস নদী মহাশোলের আবাসভূমি। নদীর পাথর-নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে ‘পেরিফাইটন’ নামে এক রকমের শ্যাওলা জন্মে, যা মহাশোলের প্রধান খাদ্য। মহাশোল সর্বোচ্চ ১৫ মিটার গভীর পানিতে চলাচল করতে পারে। পানির উষ্ণতা ১৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাদের জীবনধারণের পক্ষে সহায়ক। মহাশোল দেখতে অনেকটা মৃগেল মাছের মতো। তবে এর আঁশগুলো আরও বড়। পরিণত মাছের আঁশ শক্ত, উজ্জ্বল সোনালি রঙের ও দীপ্তিমান। পাখনা ও লেজ রক্তিম। নাকের সামনে ছোট্ট দুটি গোঁফের মতো আছে। সব মিলিয়ে দেখতে খুব সুন্দর। মিঠাপানির মাছের মধ্যে মহাশোল স্বাদেও সেরা। পাহাড়ের পাদদেশে সোমেশ^রী নদীর উৎসমুখ বন্ধ থাকায় এবং শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে মহাশোলের বসবাস ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। কদাচিৎ দুয়েকটি মহাশোল পাওয়া গেলেও প্রতিযোগিতামূলক দামে বেচাকেনা হয়। এই মাছ সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা কেজিদরে বিক্রি হওয়ার কথা শোনা যায়। গত কয়েক বছর ধরে এই মাছ পাওয়া না গেলেও এ বছর প্রবল বর্ষায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা মহাশোল ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। এসব জেলের কাছ থেকে ২৫টি মহাশোল কিনে গবেষণা পুকুরে মজুদ করেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। জেলেরা এসব মাছ প্রতিকেজি তিন থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করছে। প্রতিটি মাছের ওজন ১ কেজি থেকে সাড়ে ৫ কেজির মতো।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এইচএম কোহিনূর জানান, দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মহাশোল মাছের কৃত্রিম প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করার জন্য কয়েক বছর চেষ্টার পর এবার মহাশোলের ব্রুড মাছ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি জানান, দেশি মহাশোল মাছ দুর্লভ প্রজাতির। বাংলাদেশে যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মহাশোল হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম। এই মাছ সচরাচর দেখা যায় না। এই মাছ নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ^রী নদীতে পাওয়া যায়। কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছি মাছটি সংগ্রহ করার। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে ডমোনেস্টিক করে এর প্রজনন ও চাষাবাদ পদ্ধতি আবিষ্কার করা। চলতি বছর ৫০টি মহাশোল মাছ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ২৫টি মহাশোল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, বাংলাদেশে মহাশোলের দুটি প্রজাতি রয়েছে, যাদের নাম সোনালি মহাশোল (বৈজ্ঞানিক নাম ঞড়ৎ ঃড়ৎ) এবং লাল পাখনা মহাশোল (বৈজ্ঞানিক নাম ঞড়ৎ ঢ়ঁঃরঃড়ৎধ)। প্রজাতি দুটি মহাবিপন্ন, মহাশোল একটি দামি ও সুস্বাদু মাছ এবং এটি বিলুপ্তির তালিকায় আছে। বিশে^ মহাশোল মাছের বহু প্রজাতি আছে। ইতোমধ্যে একটি প্রজাতির (নেপালি) মহাশোলের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ কৌশল গবেষণায় সফল হওয়ায় পর দেশের বিভিন্ন নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। অনেকেই পোনা নিয়ে পুকুরেই চাষ করছে। শুধু মহাশোল নয়, হারিয়ে যাওয়া আরও ২৩টি প্রজাতি মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে চাষি পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। তিনি বলেন, এবার দেশীয় প্রজাতির সোনালি মহাশোলের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষকৌশল উদ্ভাবনে মাঠে নামা হয়েছে। এ কাজ যদি সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়, তা হলে এখন যেমন মহাশোল মাছ অনেক দামে বাজারে বিক্রি হয়, সেই মূল্য হ্রাস পাবে এবং হারিয়ে যাওয়া সোনালি মহাশোল সুলভ মূল্যে ভোক্তাদের খাবার টেবিলে ঠাঁই পাবে।