আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে নারী-পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন ভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতিতে। যাকে যে আকৃতিতে সুন্দর দেখাবে তাকে সে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এবং এতেই রেখেছেন প্রভূত কল্যাণ। সেই ধারাবাহিকতায় পুরুষের চেহারায় দিয়েছেন দাড়ি আর গোঁফ। পক্ষান্তরে নারীকে এসব থেকে মুক্ত রেখেছেন। কারণ পুরুষের পৌরুষ ও কল্যাণ দাড়ি-গোঁফে আর নারীর নারীত্ব ও সৌন্দর্য মসৃণ ত্বকে। উভয়েরই নিজ নিজ আকৃতি ও প্রকৃতিতে আল্লাহ রেখেছেন অনেক কল্যাণ ও উপকার, যা হয়তো মানুষের জ্ঞানসীমার বাইরে।
সুতরাং যে পুরুষ দাড়ি কামিয়ে নারীসদৃশ হয় তাদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার এক মহিলা ধনুকে সজ্জিত হয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণকারী নারী আর নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। (মুজামুল আওসাত : ৪/২১২)
আবার অনেকেই আছেন দাড়ি একেবারে কামিয়ে ফেলেন না। বরং ছেঁটে-কেটে বিভিন্ন স্টাইলে রাখেন। এতে বিধর্মীদের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন করলে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে হয়। বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করল সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। (আবু দাউদ : ৪০৩১)। পুরুষের জন্য দাড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব। এটা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিয়ার ও চিহ্ন এবং সব নবী-রাসুলের সুন্নাহ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতায় দাড়ি লম্বা রাখো আর গোঁফ খাটো করো। (বুখারি : ৫৮৯২; মুসলিম : ২৫৯)। দাড়ি কামিয়ে ফেললে কিংবা ছেঁটে রাখলে কবিরা গুনাহ হবে। এটা এমন এক গুনাহ, যা সর্বাবস্থায় হতে থাকে যতদিন না দাড়ি একমুষ্টি বরাবর হয়।
মুখাবয়বের চোয়ালের হাড়কে আরবিতে বলা হয় ‘লিহউন’। আর এই লিহউন অর্থাৎ চোয়ালের হাড়ের ওপর গজানো চুলকেই বলা হয় ‘লিহইয়াতুন’ অর্থাৎ দাড়ি। সুতরাং চোয়ালের হাড্ডির ওপর এবং থুঁতনিতে যে চুল থাকে সেটাকে দাড়ি বলে। এর বাইরে যে পশম গজায় সেটা দাড়ির অন্তর্ভুক্ত নয়। সেটা কাটলে দাড়ি কাটার গুনাহ হবে না। তবে সেটা একেবারে চেঁছে ফেলা নিষিদ্ধ। (ফতোয়ায়ে শামি : ৬/৪০৬)। আর দাড়ি কমপক্ষে একমুষ্টি পরিমাণ লম্বা করা ওয়াজিব। এর চেয়ে বেশি লম্বা হলে তখন কাটা জায়েজ। বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়দিক দিয়ে ছাঁটতেন। তথা অতিরিক্তটুকু কেটে ফেলতেন। (তিরমিজি : ২৭৬২; শারহু শিরআতিল ইসলাম : ২৯৮)। সাহাবায়ে-কেরামরাও দাড়ি লম্বা রেখেছেন। তবে কারও কারও থেকে একমুষ্টির পর কাটার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। হজরত মারওয়ান ইবনে সালেমে মুকাফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনে উমর (রা.)-কে দেখেছি, তিনি নিজের দাড়ি মুঠ করে ধরে বাকিটুকু কেটে ফেলতেন (আবু দাউদ : ২/৭৬৫)। হজরত ইবনে উমর (রা.) হজ ও উমরার সময় নিজ দাড়ি মুঠ করে ধরে বাইরের অংশটুকু কেটে ফেলতেন (বুখারি : ৫৮৯২)। আরও বর্ণিত আছে, বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) নিজের দাড়ি মুঠ করে ধরে বাইরের অংশটুকু কেটে ফেলতেন (ফতহুল বারি : ১০/৬৩২)। ফতোয়ায়ে আলমগীরিতে আছে, দাড়ি বেড়ে গেলে তার চতুর্দিক দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাঁটতে সমস্যা নেই। লম্বায় যদি একমুষ্টির বেশি হয় তা হলে অতিরিক্ত অংশটুকু কেটে ফেলা বৈধ। (৫/৪১৪)
আর নিমদাড়ি তথা নিচের ঠোঁটের নিম্নাংশে গজানো চুলও মূল দাড়ির অন্তর্ভুক্ত। তাই তা একেবারে চেঁছে ফেলা বা উপড়ে ফেলা যাবে না। তবে নিমদাড়ি যদি অনেক বড় হয়ে যায় এবং তাতে কোনো অসুবিধা হয় তখন তা অল্প ছোট করার অবকাশ আছে। (বুখারি : ৩৫৪৬; ফতোয়ায়ে শামি : ৬/৪০৭)। আর গোঁফ ছোট ছোট করে রাখা সর্বসম্মত সুন্নাত। এমনভাবে ছোট করা যেন ওপরের ঠোঁটের উপরাংশ স্পষ্ট দেখা যায়। তবে ক্ষুর দিয়ে একেবারে চেঁছে ফেলা বিদআত। (ফতোয়ায়ে শামি : ৬/৪০৭)। কিন্তু গভীর পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে বর্তমান যুবকরা অদ্ভুত সব স্টাইলে দাড়ি-গোঁফ রাখছে। সেসব দেখলে আশঙ্কা হয়, ইসলাম নিয়ে তারা উপহাস করছে না তো! পশ্চিমা মানসিকতার সেলিব্রিটিদের অনুসরণ করতে গিয়ে দাড়ি-গোঁফকে তারা হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করছে। এদের দাড়ি-গোঁফ রাখার প্রচলিত সব স্টাইল পরিহারযোগ্য। ইসলাম সমর্থিত নয়।
বরং সেগুলো পশ্চিমা সভ্যতার পরিচায়ক। একজন সচেতন মুসলমান কখনও পশ্চিমা সভ্যতার অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারে না। দাড়ি না রাখার আরও একটি খোঁড়া যুক্তি হচ্ছে, ‘এখনও বিয়ে করিনি’, ‘একটা চাকরি হোক পরে দাড়ি রাখব’, ‘ছেলেমেয়ে বিয়ে দেই, পরে না হয় দাড়ি রেখে দেব’ ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে দাড়ি কামিয়ে ফেলে বর্তমান মুসলমান। প্রকৃত মুসলমান কখনও এসব দুর্বল যুক্তি দেখিয়ে দাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান উপেক্ষা করতে পারেন না। আমাদের মুসলিম যুবক ভাইদের এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। সঠিকটা জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং ঠিকমতো আমল করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বিধানানুযায়ী দাড়ি-গোঁফ রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
শিক্ষক, এরাবিক মডেল মাদ্রাসা উত্তরা, ঢাকা