দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা সব মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। কোরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি জ্ঞানীদের, বিশেষত ইলম দ্বীনের ধারক-বাহকদের সমুন্নত মর্যাদা ও কৃতিত্বের কথা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন।’ (সুরা মুজাদালাহ : ১১)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।(সহিহ বুখারি)। আবু দারদা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আবিদের ওপর আলেমের ফজিলত এরূপ, যেরূপ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের ফজিলত সব তারকারাজির ওপর। আলেমরা হলেন- নবীদের ওয়ারিশ এবং নবীরা দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) মিরাস হিসেবে রেখে যান না, বরং তাঁরা রেখে যান ইলম। কাজেই যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করল, সে প্রচুর সম্পদের মালিক হলো।’ (সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিজি)।
যুগের চাহিদা, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, চিন্তার বিস্তৃতি ইত্যাদি কারণে দিন দিন মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অনস্বীকার্য যে, এটির প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। একেবারে অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র মানুষের চাহিদা হয়ে পড়েছে জেনারেল ধারার শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা। এ ছাড়া স্কুলে রয়েছে উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষার হার বাড়াতে এবং নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যেই এত এত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহ নেই, স্কুল শিক্ষাধারায় আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই পরিকল্পিত শিক্ষানীতি ও পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে সফলতাও আসছে। স্কুলের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ঝোঁক বেড়েই চলছে এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অপরদিকে কওমি মাদ্রাসা বিশেষত, এ ধারার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রশূন্যতা দুঃখজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয় বরং হতাশাজনক ও পীড়াদায়ক। যেসব প্রতিষ্ঠানে সুবিধা বেশি সেগুলোয় ভিড়ও বেশি। ধরুন, কিন্ডারগার্টেনের কথা। এগুলোয় পড়ালেখার মান ভালো, সিলেবাস সমৃদ্ধ ও উন্নত। জাতীয় সিলেবাসের বাইরের অন্যান্য বিষয় যেমন, একাধিক ভাষার ওয়ার্ড বুক, সাধারণ জ্ঞান, ইসলামী জ্ঞানকোষ, আরবি, কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয় পাঠদান করা হয়। শিক্ষকরা আন্তরিক ও বন্ধুসুলভ। আবার জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। সব মিলিয়ে মানুষ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে অধিক উপকৃত হচ্ছে। সঙ্গত কারণে এদিকে মানুষের কোলাহল ও সর্বাধিক। তবে কওমি শিক্ষা পদ্ধতিতে সর্বসাধারণের সাগ্রহ-অংশগ্রহণ বাড়ানোর চিন্তা, কৌশল ও মাস্টারপ্ল্যান কী আদৌ প্রয়োজন নয়?
কে না চায়- সন্তানসন্ততি লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষিত হোক। ভালো মানের চাকরিজীবী, পেশাজীবী বা সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। অবশ্য, এটি দোষের বা নিন্দনীয় কিছু নয়। যদি আবশ্যকীয় ও জরুরি দ্বীনি শিক্ষার সমন্বয় থাকে। বলা বাহুল্য, এটির প্রথম ধাপ হচ্ছে শিক্ষার্থীর প্রাইমারি লেভেল বা প্রাথমিক শিক্ষাকাল। অতঃপর অন্যান্য অধ্যায়।
সময়ের ধ্রুব সত্য এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে ভারত, পাকিস্তানের মাদ্রাসা শিক্ষার মতো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের প্রথম সারির অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষা কার্যক্রম ও সিলেবাস যুগোপযোগী করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের পটিয়া ও দারুল মাআরিফ ঢাকার দারুররাশাদ ও বিবাড়িয়ার দারুল আরকাম এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
ইসলামী শিক্ষার আবশ্যকীয়তা, মানুষের চাহিদা, সময়ের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন ও বিবেচনা করে প্রতিটি কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস সাজানোর বিকল্প নেই। এটি কঠিন বা অসম্ভব কিছু নেই। ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠানে এ পদ্ধতি চালু হয়েছে এবং দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে প্রতিটি মাদ্রাসায় মূল সিলেবাসের সঙ্গে জাতীয় সিলেবাস সমন্বিত করা (ন্যূনতম প্রাথমিক) সময়ের অপরিহার্য দাবি। এটি বাস্তবায়ন হলে জাতি অনেক উপকৃত হবে। আশাজাগানিয়া ফলাফল পরিলক্ষিত হবে ইনশাআল্লাহ। পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষার সুযোগ ও ব্যবস্থা রাখতে হবে। মানুষের চিন্তাচেতনা ও হৃদয়ের গভীরে একথা পৌঁছে দিতে হবে যে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম সর্বাধুনিক, বরং একধাপ এগিয়ে। স্কুলে শুধু জাতীয় পাঠ্যক্রমের আলোকে পাঠদান করা হয় আর কওমি প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসা সিলেবাস তথা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পাঠদানের পাশাপাশি জাতীয় সিলেবাসের পাঠ্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত। ফলে কওমি শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে দুই পদ্ধতির জ্ঞানার্জন করে।
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাদের ছেলেমেয়ে তথা মাদ্রাসার বাইরের স্কুলমুখী ছাত্রছাত্রীদের দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা প্রদানের মহান দায়িত্ব গ্রহণ ও আঞ্জাম দেওয়া। এককথায় কওমি ধারাকে আরও সার্বজনীন করা। মাদ্রাসা শিক্ষার চেপে পড়া এ লক্ষ্যটির প্রাণ ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগী ও সচেতন হলে সুদূরপ্রসারী ফলাফল আসবে এবং দ্বীনদার, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষানুরাগী, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিবর্গের নজর কাড়তে ও প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হবে ইনশা-আল্লাহ।
শুরু হচ্ছে নতুন বছর। শুরু হবে নতুন শিক্ষাবর্ষ। নতুন বছরে কওমি ধারার শিক্ষাপঞ্জি আরও সমৃদ্ধ হোক। সিলেবাস আপডেট হোক, অনুসরণীয় হোক। আদর্শ ও চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে জাতির কল্যাণে জাতীয় ধারার শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে মেলবন্ধন স্থাপিত হোক, সম্পৃক্ততা বাড়ুক। ভারসাম্যপূর্ণ সামঞ্জস্যতার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও সর্বসাধারণকে আরও কাছে টানার এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে সর্বস্তরের ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ফলপ্রসূ, বাস্তবমুখী পরিকল্পনায় এগিয়ে যাক ইসলামী শিক্ষার সূতিকাগার কওমি অঙ্গন। আলেমদের চিন্তা ও কর্মন্থা আরও শানিত হোক, সৃজনশীল হোক। সর্বোচ্চ সফলতায় আলোকময় হোক এ শিক্ষাধারা। কৃতিত্বের স্বর্ণ শিখরে উন্নীত হোক জ্ঞানের নববি কানন- কওমি প্রতিষ্ঠান।