শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ওপর যে শাস্তি এসেছিল

মাওলানা শামসুদ্দীন সাদী

ইসলামের আলো

পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার পাদপীঠ বর্তমান ইরাকের মাদায়েন নগরী। অধুনা বিলুপ্ত মাদায়েন নগরীতে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে আসেন হজরত শোয়াইব (আ.)। সেকালে

2021-08-07T09:06:15+00:00
2021-08-07T09:06:15+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ওপর যে শাস্তি এসেছিল
মাওলানা শামসুদ্দীন সাদী
প্রকাশ: শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১, ৯:০৬ এএম   (ভিজিট : ২৬৯৭)
পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার পাদপীঠ বর্তমান ইরাকের মাদায়েন নগরী। অধুনা বিলুপ্ত মাদায়েন নগরীতে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে আসেন হজরত শোয়াইব (আ.)। সেকালে মাদায়েনবাসীর মূল পেশা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। হজরত শোয়াইব (আ.) মাদায়েনবাসীকে প্রথমে তাওহিদ ও আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেন। সব নবী-রাসুলের এক ও অভিন্ন দাওয়াত ছিল তাওহিদ। সব নবী তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন। বাণিজ্য-নগরী মাদায়েনবাসীর একটি খারাপ স্বভাব ছিল। তারা ওজন ও মাপে মানুষকে কম দিত। ওজন ও মাপে কম দেওয়াকে তারা ব্যবসায়িক কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা মনে করত। হজরত শোয়াইব (আ.) তাদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করলেন। ওজন ও মাপ পরিপূর্ণ করে দিতে বললেন।

আল্লাহ তায়ালা কোরআন মাজিদে সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘আমি মাদায়েনে তাদের ভাই শোয়াইবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রমাণ এসে গেছে। অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দিও না এবং ভূপৃষ্ঠের সংস্কার সাধন করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বসী হও।’ (সুরা আরাফ : ৮৫)

কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরা হজরত শোয়াইব (আ.)-কে উল্টো তিরস্কার করল। তারা বলল, ‘আমাদের ধারণা- তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা শুআরা : ১৮৬)। তারা শিরকি কর্মকা- ছাড়তেও অস্বীকার করল। তদুপরি ওজনে কম দেওয়াকে তাদের অধিকার ও বুদ্ধিমত্তা হিসেবে আখ্যায়িত করল। বেচাকেনার ক্ষেত্রে নিজেদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করল। যুক্তি দেখাল, পণ্যসামগ্রী আমাদের, আমরা যেভাবে খুশি বেচাবিক্রি করব। তাতে শরিয়ত বা অন্য কারও হস্তক্ষেপ মানি না। আসলে ওজনে কম দেওয়া বুদ্ধিমত্তা ছিল না, এটি বরং প্রকাশ্য জুলুম। দুনিয়ার জীবনেও ক্ষতি ডেকে আনে পরকালেও কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করে। ব্যক্তি জীবনের বাইরে সমাজে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, অর্থনীতিতে ধর্মকে তারা অগ্রাহ্য করল। তারা যুক্তি দেখাল, কোথায় কীভাবে আমরা ব্যবসা করব, আয় উপার্জন করব তার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী? ধর্ম তো কিছু আকিদা বিশ^াস আর আচার-অনুষ্ঠানের নাম। হজরত শোয়াইব (আ.) তাদের যুক্তি খ-ন করলেন। আল্লাহর বিধান অগ্রাহ্য করলে কঠিন শাস্তির ভয় দেখালেন। তারা তো নবীর কথা শুনলই না, উল্টো নবীকে দেশান্তরিত করার এবং হত্যার হুমকি দিল। তারা এভাবে দম্ভোক্তি করল- ‘হে শোয়াইব! আপনি যা বলেছেন তার অনেক কথাই আমরা বুঝি নাই, আমরা তো আপনাকে আমাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি মনে করি। আপনার ভাই-বন্ধুরা না থাকলে আপনাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতাম। আমাদের দৃষ্টিতে আপনি কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি নন। (সুরা হুদ : ৯১)

হজরত শোয়াইব (আ.) ছিলেন আল্লাহর সম্মানিত নবী। নবীরা কারও হুমকি-ধমকি পরোয়া করেন না। একাগ্রচিত্তে নিবিষ্টমনে নিজ দাওয়াতি মিশন অব্যাহত রাখেন। ফলে তাদের হত্যার হুমকিতে তিনি বিচলিত হলেন না। বরং কাফেররাই যে চূড়ান্ত পরিণতিতে লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়ে শাস্তির সম্মুখীন হবে দৃঢ়কণ্ঠে আবার তা ঘোষণা দিলেন। আল্লাহ তায়ালা হজরত শোয়াইব (আ.)-এর সেই সত্যবাণী কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘অচিরেই জানতে পারবে কার ওপর অপমানকর আজাব আসে আর কে মিথ্যাবাদী? তোমরাও অপেক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সঙ্গে অপেক্ষায় রইলাম।’ (সুরা হুদ : ৯৩)। মাদায়েনবাসী হজরত শোয়াইবকে উপহাস করল এবং দম্ভোক্তি করল- ‘তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে আকাশের কোনো টুকরো আমাদের ওপর ফেলে দাও।’ (সুরা শুআরা : ১৮৭)

অবশেষে মাদায়েনবাসীর অবাধ্যতা ও কুফরির কারণে, ওজনে কম দিয়ে মানুষকে ঠকানোর কারণে আল্লাহর আজাব নেমে আসে। মাদায়েন নগরে প্রচ- তাপদাহ শুরু হয়। গরমে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। শীতল পানিতে নেমেও গরমের কবল থেকে বাঁচা যাচ্ছিল না। এমন প্রচ- উষ্ণতার দিনে এক দিন হঠাৎ করেই তাদের বসতির অদূরে একখ- মেঘ দেখা গেল। গরম থেকে রক্ষার জন্য কেউ কেউ মেঘের ছায়ায় আশ্রয় নিল। দেখা গেল মেঘের ছায়ায় সুশীতল বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মাদায়েনবাসী এটাকে তাদের জন্য আশীর্বাদ ভেবে সেই মেঘের ছায়ায় জড়ো হলো। মূলত এটা ছিল আল্লাহর আজাব। সবাই সমবেত হওয়ার পর এমন এক বজ্রনিনাদ আরম্ভ হলো যে, কলিজা ফেটে তাদের সবাই মারা গেল। ভূমিকম্পও হলো। প্রচণ্ড আজাবে তাদের বসতিগুলো একেবারে বিরানভূমিতে পরিণত হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন আমার হুকুম এলো, আমি শোয়াইব (আ.) ও তাঁর সঙ্গী ঈমানদারগণকে নিজ রহমতে রক্ষা করি আর পাপিষ্ঠদের ওপর বিকট গর্জন পতিত হলো। ফলে ভোর না হতেই তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা হুদ : ৯৪)

হজরত শোয়াইব (আ.)-এর জীবনী থেকে আমাদের বড় শিক্ষণীয় হলো বেচাকেনায় ওজন ও পরিমাণে কম না দেওয়া, প্রতারণা করে পরের হক নষ্ট না করা। পরের হক নষ্ট করলে আমাদের ওপরও আল্লাহর আজাব পতিত হওয়া বিচিত্র নয়। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।



Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: