বনি ইসরাইল ছিল বেয়াড়া, গোঁয়ার ও অসৎ স্বভাবের এক সম্প্রদায়। বর্তমান ফিলিস্তিন, মিসর ও শাম অঞ্চলে তাদের বসবাস ছিল। এ সম্প্রদায়ে যিনি নবী হিসেবে আগমন করতেন তিনি শাসকও হতেন। এই হিসেবে বনি ইসরাইলের প্রত্যেক নবী তাদের শাসকও ছিলেন। কিন্তু এক সময় তারা আল্লাহর অবাধ্যতা ও সীমা লঙ্ঘন করে নবী ও শাসক আলাদা করে ফেলল। নবীদের তারা ধর্মীয় বিষয়াদির ক্ষেত্রে মান্যতা দিলেও শাসক হিসেবে তাদের অস্বীকার করল।
তাদের অবাধ্যতা এতটা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে, অনেক নবী-রাসুলকে নির্দ্বিধায় হত্যাও করেছে। এমন স্পর্ধা ও সীমা লঙ্ঘনের কারণে আল্লাহ তায়ালা আমালেকা সম্প্রদায়ের জালুত নামে এক অত্যাচারী শাসককে তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। তৎকালে জালুত ছিল মহাপ্রতাপশালী এক বাদশাহ। জালুতের সঙ্গে তারা একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হতে থাকল। এমনকি তাদের শৌর্য-বীর্যের প্রতীক ‘তাবুত’ নামক একটি সিন্দুক, যার মধ্যে হজরত মুসা ও হারুন (আ.)-এর ব্যবহার্য লাঠি, আসমানি ফলক ও অন্যান্য বরকতময় সামগ্রী ছিল এবং যে সিন্দুক সামনে রেখে বনি ইসরাইল প্রতিটি যুদ্ধে যেকোনো পরাশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়লাভ করত, সেই সিন্দুকও এক যুদ্ধে তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। জালুত তাদের এই সিন্দুক নিয়ে গেল। এই সিন্দুক হারানোর পর তাদের ওপর একের পর এক দুর্যোগ নেমে আসে।
নানা দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে তাদের কিছুটা বোধোদয় হলো। তারা তৎকালীন নবী হজরত শামঈল (আ.)-এর কাছে গিয়ে আবেদন করল, আমাদের জন্য একজন শাসক নিযুক্ত করে দিন। আমরা তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করব। কিন্তু বনি ইসরাইলের অবাধ্যতা ও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছুটান ছিল সর্বজনবিদিত। তাই তাদের এমন আবেদন শুনে নবী শামঈল (আ.) কিছুটা বিস্ময় ও কিছুটা সন্দেহের সুরে বললেন, ‘এমন সম্ভাবনা আছে কি যে, যদি তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ করা হয় তোমরা যুদ্ধ করবে না?’ (সুরা বাকারা : ২৪৬)। তারা দৃঢ়কণ্ঠে এমন সন্দেহ উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাদের কী অসুবিধা যে, আমরা আল্লাহর পথে লড়াই করব না? অথচ আমরা বিতাড়িত হয়েছি নিজেদের ঘরবাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে!’ (সুরা বাকারা : ২৪৬)
নবী শামঈল (আ.) আল্লাহর ইশারায় এক হতদরিদ্র কিন্তু জ্ঞানেগুণে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ‘তালুতকে তাদের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তালুত নবী ছিলেন না, কিন্তু জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় ছিলেন অতুলনীয়। তবে বনি ইসরাইল চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী কেবল বংশগত বিদ্বেষ ও দরিদ্রের কারণে তালুতকে শাসক হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানাল। তারা বলল, ‘তা কেমন করে হয় যে, তার শাসন চলবে আমাদের ওপর। অথচ রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার ক্ষেত্রে তার চেয়ে আমরা বেশি হকদার। আর সে সম্পদের দিক থেকেও সচ্ছল নয়!’ (সুরা বাকারা : ২৪৭)। হজরত শামঈল (আ.) তাদের বোঝালেন, গরিব হলেও শারীরিক বলিষ্ঠতায় এবং জ্ঞানের দিক থেকে সে অত্যন্ত যোগ্য। তা ছাড়া আল্লাহ নিজেই তাকে রাজত্ব দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের যুক্তি ও পছন্দ-অপছন্দ এখানে অচল। তবে হজরত শামঈল (আ.) তালুতের রাজত্বের একটি নিদর্শন বলে দিলেন যে, তালুতের কাছে তোমাদের হৃতগৌরব মুসা ও হারুন (আ.)-এর বরকতময় সিন্দুক ফিরে আসবে।
বরকতময় সেই সিন্দুকটি জালুত ছিনিয়ে নিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা এটিকে বনি ইসরাইলের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। তখন দেখা গেল, জালুত এই সিন্দুকটি যে শহরেই রাখছে সেখানে মহামারিসহ নানা দুর্যোগ ও বিপদাপদ নেমে আসছে। এক শহর থেকে অন্য শহরÑ এভাবে পাঁচ শহরে সিন্দুকটি রাখা হয় এবং পাঁচটি শহরই জনমানবশূন্য এক বিরানভূমিতে পরিণত হয়। উপায়ান্তর না দেখে অতিষ্ঠ হয়ে জালুতবাহিনী সিন্দুকটি দুটি গরুর ওপর উঠিয়ে হাঁকিয়ে দেয়। ফেরেশতারা গরু দুটিকে ধীরে ধীরে বনি ইসরাইলের বসতিতে নিয়ে হাজির করে এবং তালুতের বাড়ির সামনে সিন্দুকটি রেখে দেয়। এ বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বনি ইসরাইলের লোকেরা যারা এতদিন তালুতের রাজত্ব অস্বীকার করছিল তারা তালুতের রাজত্বের ওপর আস্থাশীল হয় এবং তার নেতৃত্বে জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সঙ্কল্পবদ্ধ হয়।
এরপর তালুত বনি ইসরাইলকে একত্রিত করে। জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। নানা দুর্বিপাকে অতিষ্ঠ বনি ইসরাইল যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে। আবেগ-উদ্দীপনায় দলে দলে লোকজন যুদ্ধের তালিকায় নাম লেখায়। প্রায় ৮০ হাজার বনি ইসরাইল যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কিন্তু তালুত বনি ইসরাইলের স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তাদের শঠতা ও ধূর্তামি সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। আবেগে উদ্বেলিত হলেও বনি ইসরাইলের যুদ্ধভীতি ছিল অত্যন্ত প্রকট। ফলে যুদ্ধযাত্রার পর পথে যখন তারা তীব্র পিপাসায় পতিত হলো এবং তাদের সামনে নদী পড়ল তখন তাদের ধৈর্য কষ্টসহিষ্ণুতা ও শাসকের আনুগত্যের পরীক্ষা নিলেন। তীব্র পিপাসার সময় তাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন একটি নদীর মাধ্যমে। সুতরাং যে লোক সেই নদীর পানি পান করবে সে আমার নয়, আর যে লোক তার স্বাদ গ্রহণ করবে না নিশ্চয় সে আমার লোক।’ (সুরা বাকারা : ২৪৯)। কিন্তু বনি ইসরাইল এই নির্দেশ অমান্য করল। তারা নদীতীরে গিয়ে পেটভরে পানি পান করল। ৮০ হাজারের মধ্যে সামান্যসংখ্যক লোক তালুতের নির্দেশ পালন করল। তাদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন।
অতিমাত্রায় পানি পানকারীরা শারীরিকভাবে অত্যন্ত ভারী হয়ে গেল। ফলে তারা যুদ্ধযাত্রার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলল। নদী পার হয়ে তারা আর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতে পারল না। নদী পাড়ি দিয়ে যারা জালুতের বাহিনীর মোকাবিলায় উপস্থিত হলো তারাও দুভাগ হয়ে গেল। কিছুসংখ্যক জালুতের বিশাল সেনাবাহিনী দেখে হতোদ্যম হয়ে গেল এবং নিরাশকণ্ঠে বলল, ‘আজকের দিনে জালুত ও তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই।’ (সুরা বাকারা : ২৪৯)।
পরিপূর্ণ ঈমানদাররা নিজেদের ক্ষুদ্রতা ও সংখ্যালঘিষ্ঠতার কথা চিন্তাও করলেন না। তারা জালুতের লক্ষাধিক সেনার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার সঙ্গে তারা বলল, ‘সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় জয়ী হয় আল্লাহর হুকুমে।’ (সুরা বাকারা : ২৪৯)। অবশেষে সেই ক্ষুদ্র দলেরই জয় হয়েছিল। বিশ্বাসের ফলে মুমিনরা দুনিয়ায় যেমন জয়ী হয়, তেমনি পরকালেও লাভ করবে অফুরন্ত পুরস্কার।
(বাকি অংশ পড়ুন আগামী পর্বে)