যৌতুকের কারণে প্রতিনিয়তই ভাঙছে অসংখ্য সংসার। যৌতুকের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছে অনেক মানুষ। কেটে ফেলা হয়েছে কারও কান, উপড়ে ফেলা হয়েছে কারও চোখ, আগুনে ঝলসে দেওয়া হয়েছে কারও শরীর, ভেঙে ফেলা হয়েছে কারও হাত-পা, অ্যাসিড মেরে ঝলসে দেওয়া হয়েছে কারও মুখ। সামাজিক এই জঘন্য প্রথার আবর্তে শুধু অসহায় মেয়েরাই বিপন্ন অবস্থার শিকার হয় তা নয়; কন্যাদায়গ্রস্ত অসহায় পিতা-মাতাও এই নির্মম সংস্কৃতির বলি হয়। হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে যৌতুকের অভিশাপে।
যৌতুকের এই অভিশাপ কেবল আমাদের দেশে নয়, বরং উপমহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। মেয়েপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার প্রচলনের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পাওয়া যায় না। উপমহাদেশের বৃহত্তর সম্প্রদায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বৈবাহিক রীতিতে যৌতুকের গুর”ত্ব অত্যধিক। তাদের ধর্মে উত্তরাধিকারের সম্পদে মেয়েদের অংশীদারিত্বের স্বীকৃতি নেই। তাই বিয়ের সময়ই মোটামুটিভাবে ‘যা দেওয়া যায় ও যা নেওয়া যায়’-এর পর্বটি সম্পন্ন করা হয়। এ জন্য যৌতুক তাদের বিয়েপর্বের একটি শক্তিশালী অনুষঙ্গ ও উপলক্ষ হিসেবে সাব্যস্ত। এ অঞ্চলে প্রতিবেশী বড় সম্প্রদায়টির সংস্কৃতি ও জীবনাচারের প্রভাব মুসলমানদের জীবনে যেমন অন্য বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, তেমনি যৌতুকের ক্ষেত্রেও তাদের প্রচলিত সংস্কৃতি মুসলিম সমাজকে এতটাই আক্রান্ত করেছে যে, আমাদের দেশে যৌতুক ছাড়া বিয়ে খুবই কম হয়। যার ফলে বহু মুসলিম নারীর জীবন আজ অভিশাপের পাকে আটকে যাচ্ছে।
অথচ ইসলামের বিয়েরীতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বিয়ে বা দাম্পত্যের ক্ষেত্রে ছেলে দেবে, মেয়ে নেবে। যেমন মোহর এবং অলিমা। ইসলামী বিধান মতে বিয়েতে এই দুই খাত ছাড়া তৃতীয় কোনো খাত নেই, যা পুরোটাই পাত্র অর্থাৎ স্বামীর ওপর অর্পিত। ইসলামী বিধান মতে মেয়েও উত্তরাধিকারের সম্পদ পাবে, তাই বিয়ের সময় যৌতুকের মতো তোড়জোড়ের ব্যাপার অনুপস্থিত। বিয়েতে মেয়ে কিংবা মেয়েপক্ষের এক্ষেত্রে কিছুই দেওয়ার কথা নয়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নারীদেরকে খুশিমনে তাদের মোহর প্রদান করো।’ (সুরা নিসা : ৪)
যৌতুক একটি নিপীড়নমূলক প্রথা। এখানে কনেপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্যায়ভাবে তার পরিবার থেকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আদায় করা হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা কাউকে জুলুম করে সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করে বলেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না।’ (সুরা বাকারা : ১৮৮)। ইসলাম শুধু যৌতুক প্রথার বিরোধীই নয়, বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে সব ধরনের অপচয়েরও বিপক্ষে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সেই বিয়েই সর্বাধিক বরকতময়, যে বিয়েতে ব্যয় খুব সামান্যই হয়।’ (মুসনাদে আহমদ : ২৪৫২৯)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিয়ে করেছেন সাধারণভাবে, নিজের প্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-কে বিয়ে দিয়েছেন একইভাবে।
দেশের মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ এই যৌতুক প্রথাকে আঁকড়ে থাকার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে- সামাজিক কুপ্রথা ও কুসংস্কার। আর্থিক সুবিধা ও স্বার্থ ত্যাগ করা সাধারণভাবে মানুষের জন্য কঠিন। এতে সামাজিক রেওয়াজ ও রেওয়াজগত স্বীকৃতি থাকলে সেটি যেন আরেকটু অধিকারের ছোঁয়া পেয়ে যায়। শুর”তে অন্য সম্প্রদায়ের প্রভাবে মুসলিম সমাজে যৌতুক প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটলেও এখন আর এতে প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার কিছু নেই। এটা এখন নিজেদের মধ্যেই স্বাভাবিক একটা লেনদেন ও দেনা পাওনার হিসাবে পরিণত হয়েছে। বরের পরিবার সচ্ছল ও বিত্তবান হলেও এখন কনেপক্ষের সঙ্গে দেনা পাওনা নিয়ে কথা বলে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো এই দেনা পাওনার হিসাব বুঝে নেয়।
প্রশান্তিদায়িনী মায়াবতী নবপরিণীতা নারী যেন হরেকরকম সম্পদের বাহন, নগদ অর্থ, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ফ্রিজ, সোফাসেট, খাট-পালঙ্ক ইত্যাদি যৌতুক ছাড়া যেন সে মূল্যহীন! অথচ একটি মেয়ে বিয়ের আগে সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশে বেড়ে ওঠে। বিয়ের পরবর্তী সময়ে সে নিজের যাবতীয় চাহিদা উপেক্ষা করে অচেনা একটা জায়গায়, অজানা কিছু মানুষের সঙ্গে নিজের মা-বাবা, ভাই-বোন ও আপনজনদের ছেড়ে এসে জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুর” করে। যেখানে তাকে আমরণ সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় এবং জীবন ক্ষয় করে তিলে তিলে একটি সংসার গড়ে তুলতে হয়। নারীর এই ত্যাগ ও ক্ষয়ের মূল্য কি কেউ দিতে পারবে?
সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক প্রভাব ছাড়াও সমাজে যৌতুক গ্রহণের অন্য কারণটি হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি ভয়হীনতা এবং শরিয়তের বিধানের প্রতি অবজ্ঞা ও উদাসীনতা। নারীর মর্যাদা দান ও নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষায় ইসলাম যে বিধিবিধান দিয়েছে তার প্রতি সাধারণ পর্যায়ের সম্মানবোধ থাকলেও কোনো বরের পরিবারের পক্ষে যৌতুক গ্রহণ সম্ভব নয়। যেহেতু বিয়ে হলো একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। এতে কন্যাপক্ষ খুশিমনে বরকে বা বরপক্ষকে কিছু দিলে তা যৌতুক হবে না, বরং তা উপহার বা হাদিয়া হিসেবে গণ্য হবে। আর উপহার বা হাদিয়া প্রদান ও গ্রহণ উভয়ই সুন্নত। পারস্পরিক ভালোবাসা-সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া আদান-প্রদানের প্রতি উৎসাহিত করে বলেন, ‘তোমরা পরস্পর হাদিয়া আদান-প্রদান করো, তাহলে মহব্বত বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫৯৪)। অন্যত্র বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হাদিয়া বিনিময় করো। কারণ তা অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৯২৫০)
নবীজির চাচাতো ভাই আলী (রা.) ও কন্যা ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের ঘটনায় কিছু মানুষ যৌতুকের পক্ষে প্রমাণ ভেবে ভুল করেন। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রাসুল (সা.) শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে চাচা আবু তালেবের অভিভাবকত্বে প্রতিপালিত হন। অতঃপর আবু তালেব ইন্তেকাল করলে তার শিশুপুত্র আলী (রা.)-কেও আল্লাহর রাসুল (সা.) শুকরিয়া হিসেবে নিজের অভিভাবকত্বে নিয়ে আসেন এবং আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে বেড়ে ওঠেন আলী (রা.)। অর্থাৎ আল্লাহর রাসুল (সা.) একই সঙ্গে বর-কনে উভয়ের অভিভাবক ছিলেন। তাই বিয়ের সময় আলী (রা.)-কে সামান্য কিছু ব্যবহারিক জিনিস দিয়েছিলেন উভয়ের অভিভাবক হিসেবে। হাদিসে এসেছে, ‘প্রিয় নবী (সা.) তাঁর মেয়ে হজরত ফাতেমার (রা.) বিয়েতে তার সংসারের জন্য একটি সাদা পশমি চাদর, একটি পানির মশক এবং ইজখির ঘাসভর্তি একটি বালিশ উপহার দিয়েছিলেন।’ (নাসায়ি : ৩৩৮৪, ইবনে মাজাহ : ৪১৫২)। কন্যাপক্ষকে কোনো কিছু দিতে বাধ্য করা, চাপ সৃষ্টি করা বা পরিস্থিতি তৈরি করা যৌতুক হিসেবে বিবেচিত- যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘কারও ধন-সম্পদ তার পূর্ণ সন্তুষ্টি ব্যতীত বৈধ নয়।’ (মুসনাদে আহমদ : ২০৬৯৫)
যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধিকে সমাজ থেকে নির্মূল করার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা উচিত। আর এ জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। যৌতুক একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অপরাধÑ এই বোধ সবার মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। সর্বোপরি যৌতুক প্রথার বির”দ্ধে সরকার যেসব আইন ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। তবেই আমরা যৌতুকমুক্ত একটি শান্তির সমাজ গড়তে পারব ইনশাল্লাহ।
মুহাদ্দিস ও বিভাগীয় প্রধান, আরবি ভাষা
মদিনাতুল উলুম মাহমুদিয়া মাদ্রাসা, নারায়ণগঞ্জ