আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা

সাইফুল্লাহ আমান

অর্থনীতি

দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সঙ্কট চলছে। এই আস্থাহীনতার কারণেই বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োকারীরা। চলতি বছরের শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত

2021-12-30T10:15:59+00:00
2021-12-30T10:15:59+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা
সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১, ১০:১৫ এএম   (ভিজিট : ১০০৫)
দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সঙ্কট চলছে। এই আস্থাহীনতার কারণেই বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োকারীরা। চলতি বছরের শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ বিনিয়োগকারী তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছেড়ে গেছেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। চলতি মাসে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট খুলেছেন মাত্র ৯ হাজার গ্রাহক।
 
অন্যদিকে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার। এ ছাড়া সূচক বাড়া-কমার পালায় চলছে পুঁজিবাজার। যেদিন সূচক কমছে, সেদিন লেনদেনও কমছে। সূচক আবার বাড়লেও লেনদেন বাড়ছে না সমান হারে। এভাবে অনিশ্চয়তায় চলছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন। এ ছাড়া বাজারে এখন অসাধু ও শেয়ার কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে আগের তুলনায় বেশি- এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। 

পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য বহুদিনের। এই দুষ্ট চক্রের কবলে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে বড় ধরনের দুটি ধস দেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। এই দুটি ঘটনায় সহায়-সম্বল হারিয়েছেন অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় করা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কখনও প্রকাশ করেনি সরকার। সেই চক্র আবারও বাজার অস্থিতিশীল করতে পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে বলে জানান কয়েকজন বিনিয়োগকারী।

সাইফুল ইসলাম নামে এক বিনিয়োগকারী সময়ের আলোকে বলেন, ‘এ বছর বীমার দর আকাশ ছুঁয়েছে। দুর্বল মৌল ভিত্তির বীমা কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ বিএসইসি এ বিষয়ে নীরব। এসব শেয়ারের দর বাড়ার পেছনে কয়েকটি চক্র কাজ করছে। এদের মধ্যে বীমা মিজান এবং আবুল খায়ের হিরু অন্যতম। এসব কথা সবাই জানলেও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।’
বীমা কোম্পানিসহ কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির দর বাড়ার পেছনে আবুল খায়ের হিরুর সংশ্লিষ্টতা প্রায় ওপেন সিক্রেট। এ ব্যক্তি আবার সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিতে থেকে পুঁজিবাজারে তার দৌরাত্ম্য নিয়ে বিভিন্ন সময় বিএসইসিতে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হিরুর স্ত্রী আবার মোনার্ক হোল্ডিংস নামে একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন। এই ব্রোকারেজের চেয়ারম্যান হলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এখানে তার নিয়োগ পাওয়ার পেছনে আবুল খায়ের হিরুর প্রভাব রয়েছে বলেও জানান।

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারদর ৬৫ টাকা ১০ পয়সা থেকে ৩ মাসের ব্যবধানে ১৫৪ টাকা ৩০ পয়সায় গিয়ে লেনদেন হয়। এই কোম্পানিটির শেয়ারদর সর্বোচ্চ ২৩২ টাকা পর্যন্ত ওঠে। গতকাল এই কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। মাত্র ১২৩ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির এ শেয়ার দরকে অতিরঞ্জিত বলছেন বিশ্লেষক এবং বিনিয়োগকারীরা। এর পেছনে কারসাজি চক্রের হাত রয়েছে বলে জানান তারা। ব্যক্তির কারসাজি ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের কারসাজিও চলছে বলে জানান বিনিয়োগকারীরা। তবে কারা করছেন সে বিষয়ে কেউ নাম বলতে রাজি হননি। হাদিউল ইসলাম নামে এক বিনিয়োগকারী সময়ের আলোকে বলেন, ‘হিরু এবং মিজানের নাম সবাই জানে। কিন্তু তারা আর কতটুকু করে? এদের চেয়ে বড় বড় খেলোয়াড় মার্কেট নিয়ে খেলছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে শেয়ারবাজারে আরেকটি ধস নামবে।’

কারসাজির বিষয়ে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীদের বিপথগামী করা সহজ। এদের কোনো একটা বিষয়ে লোভ দেখাতে পারলে সে শেয়ারে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে করে ক্ষতির সম্মুখীন হন বিনিয়োগকারীরা। তবে চলতি বছরে কয়েকটি চক্র নিজেরা কেনাবেচা করে ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করতে নানা গুজব ছড়িয়ে দর বাড়িয়েছিল। এর কেন্দ্রে রয়েছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। এরা যখনই গুজব ছড়িয়েছে, তখনই দূর্বল কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বেড়েছে। তাদের স্বার্থ পূরণ হয়ে গেলে শেয়ার ছেড়ে বের হয়ে গেছেন। সে শেয়ার নিয়ে বিপদে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রোকারেজ হাউসের অ্যানালাইসিস অফিসার সময়ের আলোকে বলেন, ‘একটি চক্র এ বছর বীমার শেয়ার দিয়ে মার্কেটে কারসাজি করেছে। এ চক্রটি বীমার শেয়ারদর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। পরে সাধারণ ছোট মূলধন ও দুর্বল কোম্পানির অন্য অনেক শেয়ারদর বাড়িয়ে নিজেদের মুনাফা নিয়ে বেরিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারসাজি করা চক্রটির হাতে এখনও ফরচুন শুজ, জেনেক্স ইনফোসিস, ডেল্টা লাইফ, সোনালি পেপারের শেয়ার রয়েছে। এখন এসব শেয়ারই নিজেরা সার্কুলার ট্রেড করে লেনদেন বাড়িয়ে রেখেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার অস্থিতিশীল করতে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও ভূমিকা রাখছে। একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কিছু কোম্পানি বাজারকে প্রভাবিত করে। এদের কারণেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সবাই জানে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে এবং করতে পারে না। কারণ তারা খুবই প্রভাবশালী। কারসাজিতে সহযোগিতা করার অভিযোগে চলতি বছরে তিনটি ব্রোকারেজ হাউসের এমডিকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেয় বিএসইসি। কিন্তু প্রভাবশালী পক্ষটি সে আদেশ তুলে নিতে বাধ্য করে। এভাবেই বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী প্রায় সবাই খুব তাড়াতাড়ি লাভ চায়। এতে করে তারা গুজবে কান দেয়। প্রথমে কিছু লাভ করলেও শেষে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বলে বাজারের দোষ। কিন্তু তারা যে বিচার-বিবেচনা না করে শেয়ার কিনছে সে বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই। বর্তমানে বাজারে ১০ লাখের বেশি সক্রিয় বিনিয়োগকারী থাকলেও ১০ ভাগের ১ ভাগও পাওয়া যাবে না যারা বুদ্ধি খাটিয়ে শেয়ার কেনে। এরা কারসাজি চক্র কী শেয়ার কিনছে, তা দেখে শেয়ার কেনে। প্রতিষ্ঠানগুলোও তাই। এখন বড়রা নিষ্ক্রিয় থাকায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কোন শেয়ার কিনবে, কোনটা বিক্রি করবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। এ কারণে কয়েক মাস ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছে শেয়ারবাজার। হঠাৎ বড় উত্থান হচ্ছে, পরদিনই বড় পতন হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পতনই হচ্ছে বেশি।’

কারসাজির বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলি রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, দরপতন ও বৃদ্ধি শেয়ারবাজারের নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনা। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারসাজির অভিযোগ সবসময়ই থাকে; কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাই ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে কমিশন কারসাজিকারীদের বিষয়ে নজর রাখছে। আর কোনো ধস হওয়ার মতো অবস্থা হবে না শেয়ারবাজারে।



  বিষয়:   পুঁজিবাজার  বিনিয়োকারী 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: