বেকারের তুলনায় কর্মসংস্থান কম

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

সম্প্রতি করোনায় কর্মহীন জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করেন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত। তার গবেষণায় দেখানো হয়- দেশে কৃষি, শিল্প ও সেবা

2021-12-30T17:27:56+00:00
2021-12-30T17:27:56+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
বেকারের তুলনায় কর্মসংস্থান কম
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১, ৫:২৭ পিএম   (ভিজিট : ৬২৯)
সম্প্রতি করোনায় কর্মহীন জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করেন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত। তার গবেষণায় দেখানো হয়- দেশে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার মানুষ কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়েছেন ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন। এর মধ্যে কৃষি খাতে ১ কোটি ১৪ লাখ, শিল্প খাতে প্রায় ৯৩ লাখ, শ্রমিক এবং সেবা খাতে ১ কোটি ৫৩ লাখ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। অর্থাৎ মোট কর্মগোষ্ঠীর ৫৯ শতাংশ মানুষই কর্মহীন হয়ে পড়ে সে সময়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকার হয়েছেন সেবা খাতে। এই বিশাল কর্মহীন মানুষের কিছু অংশ কাজে ফিরতে পারলেও এখনও কর্মহীন রয়েছেন অনেকেই। অর্থাৎ বেকারত্বের তুলনায় কর্মসংস্থান হচ্ছে কম। আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনায় দেড় কোটি লোক কর্মহীন হয়ে পড়লেও সরকারিভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজারের। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন এসব পদ সৃজন করা হয়েছে। গত এক বছরে পদ সৃজনের একাধিক প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনাকালে বিভিন্নভাবে নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাবে সম্মতি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯৪টি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায় নতুন পদ ১৮ হাজার ৪৩৭টি, স্বাস্থ্য বিভাগে ২২ হাজার ৬৭৩ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদ সৃজন করা হয় ৪ হাজার ৮৪টি।

বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে করোনা মহামারির সময় বিশ্বে ১৯ কোটি লোক চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছেন। শুধু ভারতেই এর সংখ্যা ১৩ কোটি। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপে বাংলাদেশে কর্মহীন হয়েছেন এমন সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। তাদের অনেকে কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। তারা আর শহরে ফেরেননি। তবে গ্রামে বেশি কর্মহীন হয়েছেন। এখনও অনেকে কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি এমন সংখ্যাও প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপ্রতুল। তবে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাড়িয়ে বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা হলে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজন ছাড়া সরকার পদ সৃষ্টি করলে চলবে না। যাদের নতুন নিয়োগ দেবে তাদের উৎপাদনশীল খাতে আনতে হবে। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল কাজ করছে। তবে নানা ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে পারে সরকার। এতে বেসরকারি খাত চাঙ্গা হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। এদিকে বাংলাদেশে সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। আর তাদের মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ। দুই সংখ্যার মধ্যে বিয়োগ দিলেই পাওয়া যায় বেকারের সংখ্যা। আর সেটি হলো ২৭ লাখ। আর শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাজপ্রত্যাশী হওয়া সত্ত্বেও সপ্তাহে এক দিন এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে ওই ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হবে। সাধারণত জরিপ করার সময়ের আগের সপ্তাহের যেকোনো সময়ে এক ঘণ্টা কাজ করলেই তাকে বেকার বলা যাবে না। কত দিন বেকার থাকলে একজনকে দীর্ঘমেয়াদি বেকার বলা যাবে, এর কোনো সংজ্ঞা বাংলাদেশে নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বাংলাদেশের জন্য একটি মানদণ্ড মাঝেমধ্যে অনুসরণ করে। সেটি হচ্ছে, যারা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান না, তাদের ছদ্ম বেকার বলা হয়। দেশে এমন মানুষ প্রায় ৬৬ লাখ, যারা পছন্দমতো কাজ পান না। ফলে এদের বড় অংশই টিউশনি, রাইড শেয়ারিং বা বিক্রয়কর্মীসহ নানা ধরনের খণ্ডকালীন কাজ করতে বাধ্য হন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, ২০১৭ সালের হিসেবে তখন দেশে ৬ কোটি ৮ লাখ লোক কাজের মধ্যে ছিলেন। ২০১৩ সালে যা ছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ। এর মানে, ওই চার বছরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ২৭ লাখ। অর্থাৎ বছরে গড়ে পৌনে সাত লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যত লোক চাকরি বা কাজ করেন, তাদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ আত্মনিয়োজিত বা ব্যক্তিগত অংশীদারিত্ব অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য উদ্যোগের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান হয়েছে। গৃহস্থালি পর্যায়ে কাজ করেন ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত কিংবা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কাজ করেন মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর এনজিওতে আছেন দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আইএলও বলছে, করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম। ১৫-২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশই বেকার হয়েছেন। করোনার কারণে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়েছে।

এদিকে ২০২১ সাল অষ্টম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর। তাতে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা আছে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে শ্রমশক্তি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে, আর কর্মসংস্থানও বাড়বে একই হারে। অর্থাৎ শ্রমশক্তির যত প্রবৃদ্ধি, ততই কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সময়ের আলোকে বলেন, যেসব খাতে বেশি কর্মসংস্থান হয় সেখানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যেমন- কৃষির উন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান, ব্যাপক শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ব্যাংকের কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ মানসিকতা সৃষ্টি করা, আধুনিক ব্যবসা মাধ্যম যেমন ই-ট্রেড, ই-কমার্স, ই-ব্যবসার মাধ্যমে যুবকদের কর্মসংস্থান করা, আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের ব্যবস্থা করা, শ্রমনিবিড় শিল্পায়ন গড়লে দ্রুত নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে এবং দ্রুত বেকারত্ব কমানো যাবে।

/জেডও/


  বিষয়:   বেকার  কর্মসংস্থান 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: