আলোচনায় খেলাপি ঋণ ও প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি

সাইফুল্লাহ আমান

অর্থনীতি

শেষ হতে যাওয়া ২০২১ সালে খেলাপি ঋণ ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কেলেঙ্কারি আলোচনায় রেখেছিল ব্যাংকিং খাতকে। এ বছর লাখ

2021-12-31T08:58:51+00:00
2021-12-31T08:58:51+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
আলোচনায় খেলাপি ঋণ ও প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি
সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১, ৮:৫৮ এএম   (ভিজিট : ৫৫৩)
শেষ হতে যাওয়া ২০২১ সালে খেলাপি ঋণ ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কেলেঙ্কারি আলোচনায় রেখেছিল ব্যাংকিং খাতকে। এ বছর লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে খেলাপি ঋণ। এই রেকর্ড পরিমাণ খেলাপির আশঙ্কা নিয়ে নতুন বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে ব্যাংক খাত। করোনাকালে বিভিন্ন ছাড় দিয়েও বন্ধ করা যায়নি ঋণখেলাপির হার। আগামী বছর জানুয়ারি থেকেই পুরোপুরিভাবে উঠে যাচ্ছে এসব প্রণোদনা সুবিধা। সুবিধাগুলো উঠিয়ে নিলে খেলাপি ঋণ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। করোনার শুরুর বছর ২০২০-এর ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। এ বছরের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় টালমাটাল হয়ে যায় ব্যাংকিং খাত। সরকারি পাঁচ ব্যাংকের অফিসার ক্যাশ পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ করে পরীক্ষার্থীরা। তবে, বরাবরের মতো অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সত্য বলে প্রমাণিত হয় এবং সেই পরীক্ষা বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় ব্যাংকের পূর্বেকার সব নিয়োগ পরীক্ষাও।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় বুয়েটের অধ্যাপক অধ্যাপক নিখিল রঞ্জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তদন্তে। এ ছাড়া আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীসহ কয়েকজনকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়। তবে, বরাবরের মতো এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তকারী দল। 

গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় গত বছর ঋণগ্রহীতারা কোনো টাকা পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি দেখাতে পারেনি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে একরকম ছাড় দিয়ে রেখেছে। এই ছাড়ের কারণে চলতি বছর একজন গ্রাহকের যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা, ডিসেম্বরের মধ্যে তার ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেও তাকে আর খেলাপি করা যাবে না। তবুও ঋণখেলাপির হার কমানো যায়নি।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের নানান অনিয়ম চাপা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদেরও মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হতো। এসব অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদেরকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে দেওয়া হতো। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা জানায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক।

এর আগে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচা থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হককে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিলে ২৬ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাকী বিল্লাহর কাছে স্বীকারোক্তিমূলক ওই জবানবন্দি দেন তিনি।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য আরেকটি বেদনাদায়ক বছর হয়ে থাকবে ২০২১ সাল। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও খ্যাতিমান ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ মৃত্যুবরণ করেছেন। মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় বিএসএমএমইউ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

এ ছাড়া করোনার সংক্রমণে বহু কর্মী হারিয়েছে ব্যাংক খাত। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আশঙ্কা এখনও রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৭ হাজার ২৩৭ কর্মী কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে ১৪৩ জন মারা যান। গত মে মাস পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৪০০ জন। ওই সময় পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন। এ হিসাবে গেল জুন মাসে ১ হাজার ৮৩৭ ব্যাংককর্মী করোনায় আক্রান্ত হন। মারা যান ১০ জন।

প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিতরণকৃত ঋণ আদায় নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক খাত। তাই ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। ব্যবসা খারাপ হওয়ার কারণে অনেক গ্রাহক অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের সার্বিক আদায়ে। তাই নতুন করে ঋণ দিতে সাহস পাচ্ছে না অনেক ব্যাংক। কোভিডে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্বিতীয় ধাপে প্রণোদনার ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছর ১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় মেয়াদের ঋণ বিতরণ শুরু হলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রথম মেয়াদে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ প্রায় ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নে সক্ষম হয় ব্যাংক খাত। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তথ্য বলছে, তিন মাস পার হয়ে গেলেও দ্বিতীয় মেয়াদে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের হার ১ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে।

ঋণ আদায়ে মামলা করলেই আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে পার পেয়ে যান ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা। চলতি বছরের জুন শেষে মামলার জালে আটকে আছে ব্যাংকের প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের আদায়ও থেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যেসব খেলাপি ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, সেসব ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো আদালতে মামলা দায়ের করে থাকে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখন পুঞ্জীভূত মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৫৮৬টি। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছরে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় কমেছে। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের পরিমাণ অক্টোবরে কমে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসের হিসাবেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ২০২০ সালে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেড়েছিল। ওই বছর অক্টোবরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ২১০ কোটি ডলার। এ হিসাবে গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় গত মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।



  বিষয়:   খেলাপি ঋণ  প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: